একসময় এখানে ছিল দুই দেশের মানুষের মিলনমেলা। ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণা, হাঁকডাক আর বেচাকেনায় মুখর থাকত সীমান্তের এই হাট। এখন সেখানে কেবল নীরবতা। ঘাস, লতাপাতা ও আগাছায় ঢেকে গেছে হাটের শেড, প্রবেশপথ ও আশপাশের এলাকা। দীর্ঘদিনের অযত্নে অনেকটা জঙ্গলে পরিণত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার তারাপুর-ভারতের ত্রিপুরার কমলাসাগর সীমান্ত হাট।
প্রায় সাত বছর ধরে বন্ধ থাকা এই হাটের বর্তমান অবস্থা ও কার্যক্রম জানতে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কসবা উপজেলা প্রশাসন সরেজমিন পরিদর্শন করে হাটটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
সরজমিনে কসবার তারাপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সীমান্ত হাটে প্রবেশের পথে বাঁশ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। পাশে ঝুলছে ‘ভিতরে প্রবেশ নিষেধ’ লেখা নোটিশ। আদেশক্রমে বিজিবি। কিছুটা এগোলেই বাংলাদেশের শেষ সীমানা উল্লেখ করে আরেকটি সাইনবোর্ডে লেখা—‘প্রবেশ নিষেধ’।
পাকা রাস্তা ধরে ২০৩৯ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে পৌঁছালে হাতের বাঁ পাশে দেখা যায় হাটের প্রবেশপথ। গেটে ঝুলছে তালা। ভেতরে সারি সারি শেডের চারপাশে জন্মেছে ঘাস ও লতাপাতা। কোথাও নেই ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা, নেই ক্রেতাদের ভিড়।
হাটটিতে বাংলাদেশ ও ভারতের অংশে ছয়টি করে মোট ১২টি শেড রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে গণশৌচাগার, কনফারেন্স রুম, সীমানা বাউন্ডারি ও পৃথক প্রবেশগেট।
একসময় মুখর ছিল সীমান্ত
২০১৫ সালের ৭ জুন বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কসবার তারাপুর-কমলাসাগর সীমান্ত হাটের উদ্বোধন করেন। শুরুতে দুই দেশের ২৫ জন করে মোট ৫০ জন ব্যবসায়ী দোকান নিয়ে বসতেন। পরে উভয় দেশের আরও ২৫ জন করে ব্যবসায়ী যুক্ত হলে সংখ্যা দাঁড়ায় ১০০ জনে।
শুধু কেনাবেচার জায়গা হিসেবে নয়, অল্প সময়ের মধ্যেই হাটটি পরিণত হয় দুই দেশের মানুষের মিলনমেলায়। সীমান্তের দুই পাশে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ তৈরি হয়। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন হাটে।
ক্রেতা-দর্শনার্থীর চাপ বাড়তে থাকায় একপর্যায়ে ক্রেতা কার্ডের সংখ্যাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কসবা উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে বাংলাদেশি ক্রেতাদের জন্য এক হাজার কার্ড ইস্যুর প্রস্তাব ছিল। পরে ক্রেতা ও দর্শনার্থীর চাপ বেড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার কার্ডের আবেদন জমা পড়ে। শেষ পর্যন্ত কার্ডের সংখ্যা বাড়িয়ে দুই হাজার করা হয়।
চার দিনে বেচাকেনা হতো কোটি টাকার সম্ভাবনা
সীমান্ত হাটে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা মেলামাইন, খাদি কাপড়, বিস্কুট ও বেকারি পণ্য, শাকসবজি, ফল ও ফলের জুস, প্লাস্টিক সামগ্রী, লুঙ্গি-গামছাসহ গার্মেন্টস পণ্য, অ্যালুমিনিয়াম ও ক্রোকারিজ সামগ্রী, স্থানীয় তুলা, গৃহস্থালি পণ্য, কসমেটিকস ও শুঁটকি বিক্রি করতেন।
প্রতি মাসে চার দিন, রোববার বসত হাট। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি হাটবারে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা প্রায় ২০ লাখ টাকার সমমূল্যের পণ্য বিক্রি করতেন। সে হিসাবে মাসে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বেচাকেনার পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০ লাখ টাকা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, হাট চালু থাকায় সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানও তুলনামূলকভাবে কমে এসেছিল। বৈধভাবে বিভিন্ন পণ্য কেনার সুযোগ থাকায় সীমান্তপথে অবৈধভাবে পণ্য আনার প্রবণতা কমেছিল।
‘শুধু হাট ছিল না, ছিল মিলনমেলা’
কসবার জলখাবার মিষ্টি দোকানের মালিক সেবক সাহা বলেন, সীমান্ত হাট চালু থাকাকালে এলাকায় চোরাকারবার কমে গিয়েছিল। হাটে বৈধভাবে পণ্য পাওয়ায় চোরাই পথে সেসব পণ্য আনার প্রয়োজন হতো না। স্থানীয় অনেক মানুষ হাট থেকে ফলসহ বিভিন্ন পণ্য কিনে এনে বিক্রি করে লাভবান হতেন।
তিনি বলেন, ‘হাটটি শুধু কেনাবেচার জায়গা ছিল না, ছিল দুই দেশের মানুষের মিলনমেলা। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন। ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকেও লোকজন আসতেন। আমার দোকানের পেছনে বসে অনেকে গল্প করতেন, দই-মিষ্টি খেতেন। হাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই প্রাণচাঞ্চল্যও হারিয়ে গেছে।’
তারাপুর গ্রামের গৃহিণী লুৎফা বেগম স্বামীর পাশাপাশি নিজেও হাটে দোকান চালাতেন। ক্রোকারিজ ও কাপড়ের ব্যবসা করে ভালো আয় করতেন বলে জানান তিনি।
একই গ্রামের আবদুস সাত্তার হাটে বেকারি পণ্য বিক্রি করতেন। তিনি বলেন, হাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অবিক্রীত মালামালের একটি অংশ নষ্টও হয়ে যায়।
খারপার গ্রামের মো. মালু মিয়া ছিলেন সীমান্ত হাটের বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কমিটির সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘হাট চালু থাকা অবস্থায় সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান, মাদক ও চুরির মতো অপরাধও কম ছিল। মাসে চার দিন হাট বসত, ব্যবসায়ীরা ভালো ছিলেন। হাটটি আবার চালু হলে স্থানীয় মানুষ ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন।’
তবে ব্যবসায়ীদের মতে, ভারতীয় পণ্যের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ বেশি থাকায় ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বেচাকেনা তুলনামূলক বেশি হতো।
উদ্যোগ নেওয়া হলেও ফেরেনি প্রাণচাঞ্চল্য
করোনা মহামারির সময় ২০১৯ সালে হাটটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০২৪ সালের আগস্টের প্রথম দিকে এটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে তৎকালীন সরকার পতনের কারণে সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়ন হয়নি।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকায় হাটটির অবকাঠামোও জীর্ণ হয়ে পড়েছে। আগাছা ও লতাপাতায় ঢেকে গেছে বিভিন্ন স্থাপনা। একসময় যে জায়গাটি ছিল ব্যস্ত ও প্রাণচঞ্চল, এখন সেখানে কেবল নীরবতা।
গত জুন মাসের শেষ দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের কাছে সীমান্ত হাটের বর্তমান অবস্থা ও কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চিঠি দেওয়া হয়। পরে জুলাই মাসে জেলা প্রশাসন কসবা উপজেলা প্রশাসনকে সরেজমিন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয়।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ছামিউল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে হাটের সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। বর্তমানে সীমান্ত হাটটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে হাটটি আবার চালু করা হবে। এতে যেমন দুই দেশের সীমান্তবর্তী মানুষের যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়বে, তেমনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থান ও আয়-রোজগারের সুযোগও তৈরি হবে।






