ঢাকা   সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

অস্তিত্ব সংকটে দারাজ আলিবাবার বিনিয়োগ বন্ধ: বন্ধ হচ্ছে দারাজ?

Authorমোঃ লিখন মিয়া

আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬, ১০:১২ পিএম

<span class="nhu-kicker" style="--nhu-color:#ff0000;">অস্তিত্ব সংকটে দারাজ</span><span class="nhu-sep">•</span> আলিবাবার বিনিয়োগ বন্ধ: বন্ধ হচ্ছে দারাজ?
ছবি এআই

চীনের ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবা বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক বাজারগুলোতে তাদের ই-কমার্স বিনিয়োগ গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর সরাসরি ও ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে দেশের শীর্ষ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম দারাজ বাংলাদেশের ওপর। বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল শতভাগ দেশীয় এই ই-কমার্স মার্কেটপ্লেসটি এখন রীতিমতো অস্তিত্ব সংকটে ধুঁকছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, দেশের ই-কমার্স খাতের অন্যতম বড় এই প্রতিষ্ঠানটি এখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে।

বিনিয়োগের গতিপথ পাল্টাচ্ছে আলিবাবা
২০১৮ সালের মে মাসে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের বাজার দখলে থাকা দারাজ গ্রুপকে অধিগ্রহণ করে জ্যাক মার প্রতিষ্ঠান আলিবাবা। বাজার-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো রেডিও বার্তাকে নিশ্চিত করেছে যে, এরপর থেকে শুধু বাংলাদেশের বাজারেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।

কিন্তু সম্প্রতি আলিবাবার বৈশ্বিক ব্যবসায়িক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন খুচরা ই-কমার্স থেকে মুখ ফিরিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ক্লাউড সেবায় বিপুল অর্থ ঢালছে। ইতোমধ্যে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা’কে ক্লাউড ও এআই সেবা প্রদানের জন্য একটি চুক্তিও সম্পন্ন করেছে তারা। এ লক্ষ্যে হংকংয়ে ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করছে চীনা এই টেক জায়ান্ট।

পাশাপাশি, রিটেইল বা খুচরা ব্যবসার বদলে বিটুবি (B2B – সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে সেতুবন্ধন) এবং ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সে বেশি জোর দিচ্ছে আলিবাবা। বাংলাদেশকে খুচরা বাজার হিসেবে না দেখে একটি ‘সোর্সিং হাব’ বা পণ্য সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতেই এখন তাদের বেশি আগ্রহ। আলিবাবার ব্যবসায়িক মডেলের এই আমূল পরিবর্তনই মূলত দারাজে বিনিয়োগ বন্ধের মূল কারণ।

ছাঁটাই আতঙ্ক ও নেতৃত্বের রদবদল
আলিবাবার এই নীতিগত পরিবর্তনের কারণে দারাজে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। টিকে থাকতে কঠোর ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে প্রতিষ্ঠানটি। রেডিও বার্তার অনুসন্ধানে এবং দারাজের বর্তমান ও সাবেক কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আলিবাবা এরই মধ্যে পাকিস্তান ও নেপালের প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) ছাঁটাই করেছে। বর্তমানে দারাজ বাংলাদেশের সিইও বেন কিয়ান ই-কে বাংলাদেশের পাশাপাশি ওই দুই দেশের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, গত ঈদুল আজহার আগে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া এখনও চলমান। চাকরি হারানোর আতঙ্কে দিন পার করছেন কর্মরতরা, অনেকেই হন্যে হয়ে খুঁজছেন কর্মসংস্থানের বিকল্প পথ।

বেতন বকেয়া ও কর্মীদের ক্ষোভ
আর্থিক সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দারাজ বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কর্মীদের বেতন বকেয়া রাখার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানটির মধ্যম সারির এক কর্মকর্তা রেডিও বার্তাকে জানান, ম্যানেজার ও তার ওপরের পদের কর্মকর্তাদের মে মাসের বেতন গত সপ্তাহের শেষের দিকে পরিশোধ করা হয়েছে। তবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেতনের বাইরের অন্যান্য ভাতাদি এখনও বকেয়া। শুধু তাই নয়, ভাড়ায় গাড়ি সরবরাহকারী ব্যবসায়ীদের বিলও আটকে আছে কয়েক মাস ধরে।

সবচেয়ে মানবেতর পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন ছাঁটাই হওয়া কর্মীরা। তাদের অভিযোগ, আগে দারাজে ছয় মাসের কম কাজ করলেও আনুপাতিক হারে ঈদের বোনাস দেওয়া হতো। এমনকি গত ঈদুল ফিতরেও তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এবার ঈদুল আজহার আগে ছাঁটাই হওয়া বিপুল সংখ্যক কর্মীকে কোনো বোনাস দেওয়া হয়নি। এছাড়া তাদের প্রাপ্য গ্র্যাচুইটি ও নোটিশ পিরিয়ডের বেতনও আটকে রেখেছে দারাজ, যা কর্মীদের কাছে ছিল একেবারেই অকল্পনীয়।

মার্চেন্টদের অসন্তোষ ও ডেলিভারিতে অচলাবস্থা
আর্থিক এই টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে গ্রাহক পর্যায়েও। পণ্য সরবরাহকারী মার্চেন্টদের বড় অঙ্কের পেমেন্ট আটকে থাকায় অনেকেই দারাজে পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন। অন্যদিকে, বেতন-ভাতা না পাওয়ায় লজিস্টিকস ও ডেলিভারি কর্মীরা সম্প্রতি কর্মবিরতিও পালন করেন। এর ফলে পণ্য সরবরাহে মারাত্মক ধস নামে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডেলিভারি বিভাগের এক কর্মী জানান, গত মাসের ১৫ তারিখের অর্ডার করা পণ্য ২৯ তারিখেও গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

টিকে থাকার শেষ চেষ্টা ও আলিবাবার আল্টিমেটাম
রেডিও বার্তার হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, আলিবাবার প্রধান কার্যালয় থেকে দারাজ বাংলাদেশকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে আর কোনো নতুন বিনিয়োগ করা হবে না। আগামী প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে নিজস্ব আয়ে চলতে হবে, অর্থাৎ ‘ব্রেক ইভেন’ বা লাভ-ক্ষতির সমতায় পৌঁছাতে হবে। ব্যর্থ হলে আলিবাবা আর এক পয়সাও ভর্তুকি দেবে না। বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের টাকায় কোনোমতে দারাজ বাংলাদেশের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো হচ্ছে।

ব্রেক ইভেনে পৌঁছানোর মরিয়া চেষ্টায় দারাজ কর্মী সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে এনেছে। বর্তমানে থাকা প্রায় এক হাজার কর্মীর মধ্যে মাত্র ৩০০ জন নিয়মিত, বাকিরা ফ্রিল্যান্স বা চুক্তিভিত্তিক আউটসোর্সিং কর্মী। এই সংখ্যা আরও কমানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর পাশাপাশি, রাজধানীর বনানীতে প্রধান কার্যালয়ের চারটি ফ্লোরের মধ্যে দুটি এরই মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তেজগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা হাব ও সর্টিং সেন্টারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি, অর্থ সংস্থানের জন্য গাজীপুরের কালীগঞ্জের উলুখোলায় থাকা দারাজের নিজস্ব জমিও বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

বন্ধের শঙ্কা নাকি বিকল্প পথ?
দারাজের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রেডিও বার্তাকে নিশ্চিত করেছেন, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে লাভ-ক্ষতির সমতায় আসতে না পারলে দারাজ বাংলাদেশের সামনে বন্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।

তবে কার্যক্রম সরাসরি ‘বন্ধ’ না করে বিকল্প পথেও হাঁটতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। ওই কর্মকর্তা জানান, “দারাজের তেজগাঁওয়ে একটি বড় সর্টিং সেন্টার আছে, সেটি হয়তো কোনো কুরিয়ার বা লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ বা ভাড়া দেওয়া হতে পারে। দারাজের যেহেতু গ্রাহকদের কাছে একটি আস্থা আছে এবং প্রচুর অর্ডার আসে, তাই অন্য কোনো বিনিয়োগকারীর সঙ্গে একীভূতকরণ (মার্জ) বা পার্টনারশিপের চিন্তাও করা হতে পারে। তবে বাংলাদেশে যেহেতু দারাজের অন্য কোনো বিনিয়োগকারী নেই, তাই আলিবাবা হাত গুটিয়ে নিলে কার্যত প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।”

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
সার্বিক এই সংকটের বিষয়ে দারাজ বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার এ এইচ এম হাসিনুল কুদ্দুসের সঙ্গে রেডিও বার্তার পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি দেশের বাইরে থাকায় তার মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এর আগে অন্যান্য গণমাধ্যমে দেওয়া মন্তব্যে দারাজ কর্তৃপক্ষ আলিবাবার বিনিয়োগ বন্ধের খবরটিকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছিল। সে সময় দারাজের পক্ষ থেকে বলা হয়, “এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে আমরা নিজেরাই গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাব।”

সব মিলিয়ে, দেশের ই-কমার্স খাতের অন্যতম পথপ্রদর্শক দারাজ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার সুতোয় ঝুলছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই নির্ধারিত হবে প্রতিষ্ঠানটির চূড়ান্ত পরিণতি।

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!
Radio Barta App Screen 1
Radio Barta App Screen 2
রেডিও বার্তার সব নিউজ পেতে ডাউনলোড করুন মোবাইল অ্যাপ
ক্লিক করুন