একসময় কানাডার নাগরিক মার্ক কার্নিকে নিজেদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল ইংল্যান্ড। কানাডাকে ২০০৭-০৮ সালের মহামন্দা থেকে বাঁচানোর জাদুকর হিসেবে পরিচিত কার্নির এই নিয়োগ ইতিহাসে বিরল এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। তবে এবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হয়তো ততটা শোরগোল না হলেও, দেশের ভেতরে এক অভাবনীয় চমক উপহার দিয়েছে নতুন বিএনপি সরকার। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ পেয়েছেন একজন আপাদমস্তক ব্যবসায়ী— মোস্তাকুর রহমান।
পোশাক ও রিয়েল এস্টেট খাতের পরিচিত মুখ মোস্তাকুর রহমানকে দেশের আর্থিক খাতের শীর্ষ পদে বসানোর এই ঘটনা কেবল বাংলাদেশেই নয়, পুরো বিশ্বের ব্যাংকিং ইতিহাসেই এক বিরল নজির।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই কোনো ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দেখা যায়নি। আমলা, অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকারদের দীর্ঘ পরম্পরা ভেঙে এবার দেশের মুদ্রানীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার দায়িত্ব পেলেন একজন শিল্পপতি!
আইন কী বলছে?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, একজন ব্যবসায়ী কি আদৌ গভর্নর হতে পারেন? মজার ব্যাপার হলো, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২’-এ গভর্নর হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পেশাগত বাধ্যবাধকতার কথা বলা নেই। আইনে বলা আছে, সরকার চার বছরের জন্য গভর্নর নিয়োগ দেবে এবং চাইলে মেয়াদ বাড়াতে পারবে। এমনকি ২০২৪ সালে আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা আহসান এইচ মনসুরকে নিয়োগ দেওয়ার সময় গভর্নরের সর্বোচ্চ বয়সসীমা (৬৭ বছর) তুলে নেওয়া হয়েছিল। যেহেতু সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব রয়েছে, তাই সরকার যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকেই এই পদে বসাতে পারে।
বিশ্বমঞ্চের চিত্র ও বাংলাদেশের ভিন্নতা
উন্নত বিশ্ব এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সাধারণত আর্থিক বাজার, সামষ্টিক অর্থনীতি বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরাই এই পদে আসেন।
- ভারত: রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) বর্তমান গভর্নর শক্তিকান্ত দাস মূলত একজন আমলা ও সাবেক অর্থসচিব।
- শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান: দুই দেশের গভর্নরই দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদার ব্যাংকার।
- জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া: এই দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদরা।
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে দক্ষতা ও অরাজনৈতিক টেকনোক্র্যাট পরিচয়কেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে বাংলাদেশের এই নতুন পদক্ষেপ বেশ সাহসী এবং একইসঙ্গে কৌতূহলোদ্দীপক।
ফিরে দেখা: অতীত গভর্নরদের আমলনামা
১৯৭২ সালে প্রথম গভর্নর আ ন ম হামিদুল্লাহ থেকে শুরু করে সদ্য বিদায়ী আহসান এইচ মনসুর— বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পদটি বরাবরই আমলা, ব্যাংকার বা অর্থনীতির অধ্যাপকদের দখলে ছিল। এম নূরুল ইসলাম ছিলেন প্রথম আমলা গভর্নর। এরপর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, ড. ফখরুদ্দীন আহমদ, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, আতিউর রহমান থেকে শুরু করে ফজলে কবির বা আব্দুর রউফ তালুকদার— সবাই এসেছেন প্রশাসন বা অর্থনীতির গভীর জ্ঞান নিয়ে। হাসিনা সরকারের পতনের পর রউফ তালুকদারের নীরব বিদায় এবং আহসান এইচ মনসুরের পর এবার সেই চেনা ছক ভাঙল।
ভারতের সাবেক গভর্নর রঘুরাম রাজন বলেছিলেন, “গভর্নর কেবল ব্যাংকের পরিচালক নন, তিনি দেশের পুরো অর্থনীতির ঝুঁকি নিয়ন্ত্রক। তাঁকে হতে হয় অরাজনৈতিক।” নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিজেকে অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ প্রমাণ করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল কাজ ও নতুন গভর্নরের চ্যালেঞ্জ
একটি দেশের অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাখার লাইফলাইন হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অনুযায়ী এর প্রধান কাজগুলো হলো:
১. মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও ঋণপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া হতে না দেওয়া।
২. টাকার সরবরাহ ঠিক রেখে অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখা।
৩. ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি ও খেলাপিদের নিয়ন্ত্রণ করা।
৪. নিরাপদ ও আধুনিক পেমেন্ট ব্যবস্থা পরিচালনা করা।
৫. সংকট মোকাবিলায় সরকারকে সঠিক অর্থনৈতিক পরামর্শ দেওয়া।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে বিস্তর সমালোচনা রয়েছে। প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপে ব্যাংক দখল, লুটপাট ও বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ সৃষ্টির সময় বাংলাদেশ ব্যাংক অনেকটাই ‘সহায়তাকারীর’ ভূমিকায় ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
কেন একজন ব্যবসায়ী সফল হতে পারেন?
সব সমালোচনার বাইরেও একটি আশার জায়গা রয়েছে। যেহেতু নতুন গভর্নর নিজেই একজন ব্যবসায়ী, তাই দেশের শিল্পপতিরা কেন ঋণখেলাপি হন, কীভাবে ঋণের টাকা পাচার হয় বা ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের কাছ থেকে কী ধরনের অন্যায্য সুবিধা নেন— তার চেয়ে ভালো কেউ জানেন না। ‘চোরের মন পুলিশ পুলিশ’ প্রবাদের মতো, একজন ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি যদি সততার সাথে ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে হাত দেন, তবে খেলাপি ঋণের লাগাম টানা তাঁর জন্য অন্যদের চেয়ে সহজ হতে পারে।
জরুরি এখন জবাবদিহিতা
বিশ্বের সব দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়, পাশাপাশি থাকে কড়া জবাবদিহিতা। ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার’-এর ৩৮এ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, গভর্নরকে বছরে অন্তত একবার অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে হাজির হয়ে মুদ্রানীতি নিয়ে জবাবদিহি করতে হবে। দুঃখজনকভাবে, অতীতে এই নিয়মের কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি।
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান কি পারবেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে দেশের অর্থনীতিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে? নাকি তিনিও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাছে মাথা নত করবেন? এই উত্তর লুকিয়ে আছে সময়ের হাতে। তবে রেডিও বার্তার বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট— জবাবদিহিতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে, চেয়ারে যিনিই বসুন না কেন, অর্থনীতির চাকা সচল রাখা অসম্ভব হবে।






