বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চালানো সাম্প্রতিক গবেষণায় জরায়ুমুখের ক্যানসারের প্রধান কারণ হিসেবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচআর-এইচপিভি) সংক্রমণের হার এলাকায় এলাকায় পার্থক্য থাকলেও মোট মিলেই কম ধরা গেছে। সংক্রমণের হার সর্বনিম্ন ২.৫৬ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৭.১ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ্য করা গেছে।
২৫ মে রবিবার, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে জনসংখ্যাভিত্তিক জরায়ু মুখ ও স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং প্রকল্পের তথ্য ও গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি প্রকল্পের অগ্রগতি, সাফল্য, বিস্তার ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
গবেষণাগুলোর ফলাফল দেশের জরায়ু মুখ ও স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং কার্যক্রম উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা স্বাস্থ্যকর্মী, সরকার ও সংশ্লিষ্টদের একত্রে কাজ করে ভবিষ্যতে স্ক্রিনিং কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানান।
উপকূলীয় ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে (যেমন সিলেট, বরিশাল, চট্টগ্রাম) এইচআর-এইচপিভি স্ক্রিনিং কার্যক্রম চালু করার পাশাপাশি, গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে সমান গুরুত্ব দিয়ে ৩৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্ক্রিনিং সম্প্রসারণ, জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত ই-স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন, ভায়া ও এইচপিভির সম্মিলিত পদ্ধতিতে রোগ শনাক্তকরণ ও ফলো-আপ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া ল্যাবরেটরি ও হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্টিংকে ই-এইচআইএসের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাবও দেয়া হয়।
অনুষ্ঠানে সেরা কমিউনিটি ক্লিনিক, সেরা ভায়া ও সিবিই কেন্দ্রসহ মোট ৪৬ জনকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
বিএমইউর সহযোগী অধ্যাপক ডা. নূর-ই-ফেরদৌসের নেতৃত্বে উপকূলীয় অঞ্চলের ঝালকাঠি, কক্সবাজার ও বাগেরহাট জেলার ৯০০ বিবাহিত মহিলার উপর গবেষণায় ২.৫৬ শতাংশ হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে। ঝালকাঠিতে সংক্রমণ সর্বোচ্চ (৩%) এবং জিনোটাইপ হিসেবে এইচপিভি ১৬ সবচেয়ে বেশি (৩৮.৪৬%) পাওয়া যায়। গবেষকরা এই অঞ্চলে জিনোটাইপিং-ভিত্তিক স্ক্রিনিং প্রবর্তনের সুপারিশ করেছেন।
অন্যদিকে, অধ্যাপক ডা. শিরিন আক্তার বেগমের নেতৃত্বে ৩,৮৫৬ জন মহিলার উপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের সামগ্রিক এইচআর-এইচপিভি সংক্রমণ ৩.৬ শতাংশ। সর্বোচ্চ সংক্রমণ সিলেটে (৬.৪%) এবং সর্বনিম্ন রাজশাহীতে (১.৭%) ধরা পড়ে। সিলেটের গ্রামীণ এলাকায় সংক্রমণ শহরের তুলনায় বেশি (৭.১%) এবং ৩৫-৩৯ বছর বয়সীদের মধ্যে সংক্রমণ সর্বোচ্চ।
মুগদা মা ও শিশু হাসপাতালের ডা. জাকান্ত ফাইকারের গবেষণায় দুই ধরনের স্ক্রিনিং পদ্ধতির তুলনা করা হয়, যেখানে ভায়া+এইচপিভি পদ্ধতিতে ৫.৯ শতাংশ পজিটিভ পাওয়া গেছে, যা শুধু এইচপিভি পদ্ধতির ৩.৭ শতাংশের চেয়ে বেশি। একত্রিত পদ্ধতিতে রোগ শনাক্তকরণ এবং ফলো-আপের হারও বেশি হওয়ায় এটি কার্যকারিতার উন্নতি করে।
ডা. আসমা আক্তার সোনিয়ার পরিচালিত পাইলট গবেষণায় ১০ হাজার ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী মহিলার মধ্যে ৩.২ শতাংশ এইচআর-এইচপিভি সংক্রমণ পাওয়া যায়। এইচপিভি ১৬ এবং ১৮ জিনোটাইপের উপস্থিতি যথাক্রমে ১ শতাংশ ও ০.২ শতাংশ ধরা পড়ে। গবেষণায় উচ্চ সংবেদনশীলতার জন্য এইচআর-এইচপিভি পরীক্ষা ভায়া পরীক্ষা থেকে বেশি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং নিয়ে ডা. সাদিয়া রসুলের গবেষণায় ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন (সিবিই) ও ম্যামোগ্রাফির সম্মিলনে ৯৩.৩ শতাংশ সংবেদনশীলতা এবং ৯৭.৬ শতাংশ নির্দিষ্টতা দেখা গেছে, যা প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যানসার শনাক্তকরণের জন্য সিবিইর গুরুত্ব প্রমাণ করে।
জাতীয় পর্যায়ে রাজশাহী বিভাগে বিএমইউর অধ্যাপক আশরাফুন্নেসার নেতৃত্বে ডিএইচআইএস২-ভিত্তিক ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে স্ক্রিনিং কার্যক্রম পরিচালনা ও মূল্যায়ন করা হয়েছে। এপ্রিল ২০২৪ পর্যন্ত ১৪,২১৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে, যা স্ক্রিনিং, কলপোস্কোপি ও রোগীদের ট্র্যাকিংয়ের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করেছে। তবে দুর্বল ইন্টারনেট ও জাতীয় পরিচয়পত্র বিষয়ক সীমাবদ্ধতা এখনও চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৬০ লাখ ৯৩ হাজার ২২৪ জন মহিলার ভায়া পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ২,০৫,৩৫৮ জন পজিটিভ পাওয়া গেছে, যা ৩.৩৭ শতাংশ। বর্তমানে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২১ শতাংশ মহিলাই স্ক্রিনিং কর্মসূচির আওতায় আসতে পেরেছেন।
এই দুই পর্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন বিএমইউর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার।





