‘আমাকে বাঁচাও বাপ… খুব কষ্ট হচ্ছে… একটা আইসিইউ জোগাড় করো।’ মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে এভাবেই বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন ৪০ বছর বয়সী মালয়েশিয়া ফেরত প্রবাসী মো. জাহাঙ্গীর আলম। কিন্তু হাজারো চেষ্টা করেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে একটি আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) শয্যা জোগাড় করতে পারেননি তার চিকিৎসায় সহায়তাকারী মেডিকেল শিক্ষার্থী আলফাজ হোসেন। অবশেষে বিনা চিকিৎসায়, চোখের সামনেই মৃত্যুযন্ত্রণা নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন জাহাঙ্গীর। দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সংকটের এই নির্মম চিত্র আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমাদের স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা।
দালালের খপ্পর এবং সর্বস্বান্ত এক পরিবার
সাতক্ষীরার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ২০১৮ সালে অনেক টাকা ধারদেনা করে দালালের মাধ্যমে পাড়ি জমিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। সেখানে গিয়ে নিজে তো টাকা পাঠাতেই পারেননি, উল্টো দালালের প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে পেটের মারাত্মক রোগ ‘একিউট নেক্রোটাইজিং প্যানক্রিয়াটাইটিস’-এ আক্রান্ত হন তিনি। প্রায় এক মাস ধরে তার মলত্যাগ ও স্বাভাবিক খাওয়াদাওয়া বন্ধ ছিল।
বাবার এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় দিশেহারা হয়ে পড়ে ১৮ বছর বয়সী ছেলে আফজাল হোসেন। দশম শ্রেণিতেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে সংসারের হাল ধরতে ট্রাক্টরের স্টিয়ারিং ধরতে হয়েছে তাকে। বাবার চিকিৎসার খরচ এবং দেশে ফিরিয়ে আনার টিকিট জোগাড় করতে শেষ সম্বল জমি বন্ধক রাখতে হয়েছে, বিক্রি করতে হয়েছে গোয়ালের গরু। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দেশে ফেরেন জাহাঙ্গীর। অবস্থা এতটাই বেগতিক ছিল যে, তাকে গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরায় নেওয়ার সুযোগও পাননি স্বজনেরা। ওই রাতেই ঢাকার কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে ভর্তি করানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি, ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলেই নিভে যায় তার জীবনপ্রদীপ।
আইসিইউ যেন সোনার হরিণ: তদবির ছাড়া মেলে না বেড!
ঢাকা মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আলফাজ হোসেন রোগীর দূরসম্পর্কের এক ভাইয়ের অনুরোধে জাহাঙ্গীর আলমের চিকিৎসার সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ওষুধ কেনা থেকে শুরু করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা—সবই করেছেন। ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা বারবার জাহাঙ্গীরকে দ্রুত আইসিইউতে স্থানান্তরের তাগিদ দিচ্ছিলেন। কারণ, মারাত্মক শকে থাকা এই রোগীর জীবন বাঁচাতে আইসিইউর বিকল্প ছিল না।
কিন্তু একটি আইসিইউ বেডের জন্য আলফাজের সব দৌড়াদৌড়ি ব্যর্থ হয়। আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন ভবন, পুরোনো ভবন, বার্ন ইউনিট, সার্জিক্যাল আইসিইউ—সব জায়গায় ঘুরেছি, রিকোয়েস্ট করেছি। কিন্তু বারবার শুধু সিরিয়ালে নাম লিখে ফিরে আসতে হয়েছে। রোগীর আর্থিক সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ খোঁজার চেষ্টা করি। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ!’
ঢামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২৬০০ শয্যার এই হাসপাতালে সবসময় চার হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকে। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মিলিয়ে আটটি আইসিইউ ইউনিটে শয্যা রয়েছে মাত্র ১৪০টি। একটি বেড খালি হওয়ার অপেক্ষায় প্রতিদিন সিরিয়ালে থাকেন অন্তত ৪০ জন মুমূর্ষু রোগী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢামেকের আইসিইউ বিভাগের এক চিকিৎসক চরম এক সত্য তুলে ধরে জানান, ‘আইসিইউতে যে বেডগুলো থাকে, তার জন্য শুধু হাসপাতালের ভেতরের রোগীই নয়, মন্ত্রী-এমপিসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশ থাকে বাইরের রোগীদের ভর্তি করার জন্য। আইসিইউর জন্য দিনে ১৫০টি আবেদন এলে আমরা বড়জোর ২০-৩০ জনকে সুযোগ দিতে পারি। এর মধ্যে জনবল সংকট আর নষ্ট যন্ত্রপাতির ভোগান্তি তো আছেই। নিয়ম অনুযায়ী ভর্তি রোগীর ১০ শতাংশের জন্য আইসিইউ থাকা বাধ্যতামূলক হলেও, আমরা তার অর্ধেকও পূরণ করতে পারছি না।’ তার মতে, ঢামেক হাসপাতালে অন্তত ৪০০ আইসিইউ শয্যা জরুরি।
জাহাঙ্গীর বা শাহীন: মৃত্যুর এই মিছিল থামবে কবে?
জাহাঙ্গীরের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৩ সালের এপ্রিলে ফেনীর মোটবি ইউনিয়নের ৩৮ বছর বয়সী যুবক মো. শাহীনও ঠিক একইভাবে আইসিইউর অভাবে মারা যান। সড়ক দুর্ঘটনায় মাথা থেঁতলে যাওয়া শাহীনকে নিয়ে তার স্বজনেরা ফেনী, চট্টগ্রাম মেডিকেল ও ঢাকার নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল ঘুরে ঢাকা মেডিকেলে এসেছিলেন। কোথাও একটি আইসিইউ মেলেনি। বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ করার সামর্থ্য না থাকায়, বিনা চিকিৎসায় অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই অক্সিজেনের মাস্ক পরা অবস্থায় মারা যান শাহীন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘হেলথ বুলেটিন ২০২৩’-এর তথ্যমতে, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সরকারিভাবে সারা দেশে মাত্র ৭২৮টি নতুন আইসিইউ শয্যা স্থাপন করা হয়েছে। সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে সর্বমোট আইসিইউ শয্যার সংখ্যা মাত্র এক হাজার একশর ঘরে। বেসরকারি পর্যায়ে আরও হাজারখানেক বেড থাকলেও, এর আকাশছোঁয়া খরচ সাধারণ বা নিম্নবিত্ত মানুষের ধরাছোঁয়ার সম্পূর্ণ বাইরে।
‘আজও ফোনের অপেক্ষায় আছি…’
জাহাঙ্গীরের মৃত্যু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অপর্যাপ্ত বরাদ্দ আর পরিকল্পনাহীনতারই চরম বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন শিক্ষার্থী আলফাজ হোসেন। তার আক্ষেপের সুর যেন পুরো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনের কথা। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা এ দেশে এখনো মানুষের মৌলিক অধিকার হতে পারেনি। এখানে গরিব মানুষের জীবন কর্পূরের মতো নীরবে উড়ে যায়। যেদিন আপনার নিজের বাবা বা ভাই আইসিইউর অভাবে মারা যাবে, সেদিন এই যন্ত্রণাটা হাড়ে হাড়ে টের পাবেন।’
ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আলফাজ আরও বলেন, ‘সেদিন যে আইসিইউ বেডের জন্য সিরিয়াল দিয়ে এসেছিলাম, আজ পর্যন্ত কোনো আইসিইউ থেকে আমাকে কল করা হয়নি। আমি এখনো ফোনের অপেক্ষায় আছি। ফোন এলে তাদের বলব আর আইসিইউ লাগবে না, রোগী তো মরেই গেছে!’
আলফাজ হোসেন, শিক্ষার্থী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
সাধারণ মানুষের জীবনের কি আসলেই কোনো মূল্য নেই? নাকি এভাবেই প্রভাবশালীদের তদবির আর আইসিইউ বাণিজ্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে একের পর এক জাহাঙ্গীর আর শাহীনদের অকালে প্রাণ দিতে হবে? উত্তর জানা নেই কারও।






