তুরস্ক ২০টি কান ব্লক-১০ যুদ্ধবিমান ক্রয়ের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের শেষের দিকে এগুলো তুর্কি বিমানবাহিনীতে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তুর্কি অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (তুসাস) কর্তৃক তৈরি এই যুদ্ধবিমানটি একটি দ্বৈত ইঞ্জিনের পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট, যা ম্যাক ১. ৮ গতিবেগে ছুটতে সক্ষম। এর সর্বোচ্চ উচ্চতা ৫৫,০০০ ফুট এবং সর্বোচ্চ উড্ডয়ন ওজন ৩৪,৭৫০ কেজি।
তুরস্ক তার নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’-এর জন্য একটি চূড়ান্ত ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার অধীনে ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০টি বিমান তুর্কি বিমানবাহিনীকে সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এই চুক্তিটি ব্লক-১০ কনফিগারেশনের ২০টি বিমানের জন্য করা হয়েছে। ‘উলু সাভুনমা’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম বিমানটি ২০২৮ সালে সরবরাহ করা হবে এবং পুরো ব্যাচটি ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে। ‘ব্লক-১০’ হলো প্রাথমিক উৎপাদনের একটি মানদণ্ড—এটি এমন একটি প্রাথমিক কনফিগারেশন যা সাধারণত আরও উন্নত ভ্যারিয়েন্ট বা ব্লকের আগে আসে। এই পরবর্তী ব্লকগুলোতে আরও সক্ষম সিস্টেম, উন্নত অস্ত্র সংহতি এবং সফটওয়্যার আপগ্রেড যুক্ত থাকে।
তুরস্ক যখন তাদের প্রথম ধাপের উৎপাদন নিশ্চিত করছে, তখন সমান্তরালভাবে আরও উন্নত সক্ষমতাসম্পন্ন পরবর্তী ব্লকগুলোর উন্নয়ন কাজও চালিয়ে যাচ্ছে।
‘কান’ তৈরি করেছে তুর্কি অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (তুসাস)। এর মাধ্যমে তুরস্ক সেই স্বল্পসংখ্যক দেশের তালিকায় নাম লেখাল, যারা নিজস্ব শিল্পভিত্তি ব্যবহার করে সম্পূর্ণভাবে একটি পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নকশা, উন্নয়ন এবং উৎপাদন করতে সক্ষম। এটি একটি দ্বৈত ইঞ্জিনের, নিম্ন-দৃশ্যমান মাল্টিরোল প্ল্যাটফর্ম, যা আকাশপথে আধিপত্য বিস্তার থেকে শুরু করে গভীর আক্রমণ পর্যন্ত সব ধরণের মিশনের জন্য উপযুক্ত।
বিমানটির শারীরিক কাঠামো এটিকে বৃহৎ ও শক্তিশালী ফাইটার জেটের সারিতে দাঁড় করিয়েছে। এর দৈর্ঘ্য ২০.৩ মিটার, উইংসপ্যান (পাখার বিস্তার) ১৩.৪ মিটার এবং উচ্চতা ৫ মিটার।
কানের দুটি আফটারবার্নিং টার্বোফ্যান ইঞ্জিন প্রয়োজনীয় ‘থ্রাস্ট-টু-ওয়েট’ রেশিও প্রদান করে, যা বিমানটিকে ম্যাক ১.৮ গতিতে উড়তে এবং ৫৫,০০০ ফুট উচ্চতায় কার্যকর থাকতে সাহায্য করে।
তুসাস ‘কান’-এর নকশায় কেবল গতি বা উচ্চতা নয়, বরং আরও অনেক আধুনিক বৈশিষ্ট্য যুক্ত করেছে। লো অবজারভেবিলিটি বা রাডারের চোখ এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা এর নকশার মূল ভিত্তি। এছাড়া আফটারবার্নার ছাড়াই সুপারসনিক গতিতে ওড়ার ক্ষমতা, উচ্চতর কৌশল প্রদর্শনের ক্ষমতা এবং বর্ধিত অপারেশনাল রেঞ্জ এর অন্যতম লক্ষ্য। এর অ্যাভিওনিক্স আর্কিটেকচারে রয়েছে সেন্সর ফিউশন, উন্নত ডেটালিংক কানেক্টিভিটি এবং প্রিসিশন-গাইডেড অস্ত্রের সমন্বয়।
২০১৯ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার ফলে তুরস্ককে আমেরিকার এফ-৩৫ প্রোগ্রাম থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই ঘটনাটি তুরস্ককে নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরিতে আরও গতিশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘কান’-এর প্রথম প্রোটোটাইপ সফলভাবে উড্ডয়ন করে।
ইঞ্জিনের বিষয়টি এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ব্লক ১০ বিমানগুলোতে জেনারেল ইলেকট্রিক এফ১১০ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে (যা এফ+১৬ বিমানেও ব্যবহৃত হয়)। তবে তুরস্ক ভবিষ্যতে নিজস্ব ইঞ্জিন তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে যাতে বিদেশি নির্ভরতা পুরোপুরি দূর করা যায়।
২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই সরবরাহ শুরু হলে তুরস্কের পুরনো এফ-১৬ বিমানগুলো অবসরে যাওয়ার সময় একটি শক্তিশালী বিকল্প তৈরি হবে। যদিও ২০টি বিমান একটি বড় বিমানবাহিনীর তুলনায় খুব বেশি নয়, তবে এটি নতুন এই প্ল্যাটফর্মের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো—যেমন পাইলট প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী এবং গ্রাউন্ড সাপোর্ট সিস্টেম তৈরির জন্য যথেষ্ট।
তথ্যসূত্র: ডিফেন্স ব্লগ






