চলমান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের দেওয়া সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাব গ্রহণের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আহ্বান জানিয়েছেন আরব বিশ্বের শীর্ষ নেতারা। শনিবার (২৩ মে) ট্রাম্পের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের ফোনালাপে তারা যুদ্ধ বন্ধে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সময়ে তেহরানে চলমান মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনা থেকেও ইঙ্গিত মিলেছে যে, দীর্ঘ অচলাবস্থার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্ভাব্য একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতারা ট্রাম্পকে অন্তর্বর্তীকালীন একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির আগে এই ধরনের অন্তর্বর্তী সমঝোতা যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
হোয়াইট হাউস ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক মহল ফোনালাপটিকে ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এক আঞ্চলিক কূটনীতিক বলেন, শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমে যে অগ্রগতি অর্জন করেছেন, তার প্রশংসা করেছেন আরব নেতারা। একই সঙ্গে তারা এই শান্তি প্রচেষ্টায় পূর্ণ সমর্থনের কথাও জানিয়েছেন।
এর আগে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তির সম্ভাবনা এখন “ফিফটি-ফিফটি” অবস্থায় রয়েছে। তিনি জানান, রবিবারের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করা হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। ট্রাম্প আরও বলেন, আলোচনা সফল হলে একটি ভালো চুক্তি হতে পারে, অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পথ বেছে নেবে।
এদিকে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তেহরানে চলমান আলোচনায় কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই পক্ষ আপাতত একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, যাতে পরবর্তীতে স্থায়ী ও বিস্তারিত চুক্তির পথ তৈরি হয়।
ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও জানিয়েছেন, পর্দার আড়ালে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। তিনি বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে বড় কোনো ঘোষণা আসতে পারে।
এই আলোচনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর পাশাপাশি পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের শীর্ষ কর্মকর্তারাও যুক্ত রয়েছেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন। একই সময়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকেও হোয়াইট হাউসে দেখা গেছে, যা প্রশাসনের জরুরি তৎপরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে পুরো পরিস্থিতির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। ইসরায়েলের আশঙ্কা, যদি সম্ভাব্য চুক্তিটি কেবল যুদ্ধবিরতি ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিষয়টি বাদ পড়ে যায়, তাহলে তা তেল আবিবের জন্য বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পের সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ও রজার উইকার ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে দুর্বল কোনো চুক্তি ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে এবং সেটি ইসরায়েলের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা মূলত যুদ্ধ বন্ধ, মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিচ্ছে। তবে বর্তমান আলোচনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত নয় বলে স্পষ্ট করেছে তেহরান।
পাকিস্তান ও কাতারও আলোচনার বিষয়ে সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টার নিবিড় কূটনৈতিক আলোচনা একটি চূড়ান্ত সমঝোতার পথ তৈরি করেছে। তবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, ইরান তার জাতীয় অধিকার থেকে একচুলও সরে আসবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র আবারও যুদ্ধ শুরু করলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে। তথ্যসূত্র : সিএনএন
বার্তা বাজার/এমএইচ






