বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক নীতি এবং আসন্ন বাজেট পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকার একটি বিকল্প ‘ছায়া বাজেট’ ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
‘বাংলাদেশ ২.০: সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ১২টি প্রধান খাতে মোট ৭১টি সুনির্দিষ্ট নীতিগত প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে দলটি। একই সঙ্গে ব্যাংক খাত ও গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে রাজধানীর রূপায়ণ টাওয়ারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির ছায়া বাজেট কমিটির উদ্যোগে এই প্রস্তাবনাগুলো গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে এনসিপির মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া একটি সংকটাপন্ন অর্থনীতি পেয়েছে। দেশে খেলাপি ঋণ এখন ৩০ শতাংশের বেশি। প্রতিবছর জ্বালানি আমদানিতেই দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে, যার সঙ্গে যোগ হয়েছে অপব্যবহারমূলক ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা।’ তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ আমলে পরিসংখ্যান বিকৃত করে অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হয়েছিল।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৫ সহ অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া বিভিন্ন সংস্কারমুখী পদক্ষেপের প্রশংসা করে হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, ‘বিএনপি সরকার সেই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের রূপরেখা থেকে সরে এসেছে এবং অধ্যাদেশটি বিকৃত করেছে।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং দেশের মাত্র ৬.৭ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাত অর্থনীতির জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। সরকারের ঘোষিত ১ কোটি ৪০ লাখ স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘এই অর্থ কি অন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে কেটে নেয়া হবে, নাকি নতুন কোনো উৎস থেকে আসবে–তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।’
এনসিপির প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৮,৫২,১৫৭ কোটি টাকা, যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ৭.৮৭ শতাংশ (৬২,১৫৭ কোটি টাকা) বেশি। দলটি ১৩ শতাংশ নামমাত্র প্রবৃদ্ধি (নমিনাল গ্রোথ) ধরে জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ২৬০ কোটি টাকা প্রক্ষেপণ করেছে। এ ছাড়া বর্তমানের ৯.২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি আগামী অর্থবছরে ৮ শতাংশে এবং পরবর্তী অর্থবছরে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
দলটির পক্ষ থেকে ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ড. আতিক মুজাহিদ এবং উপ-প্রধান আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল ১২টি খাতে বিভক্ত ৭১টি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। খাতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: রাজস্ব ও সামষ্টিক অর্থনীতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, পরিষ্কার জ্বালানি, এবং সরকারি কর্মচারী ও শাসন সংস্কার। ২০১৫ সালের পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা না করায় এই খাতেও সংস্কারের প্রস্তাব দেয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ এবং জাতীয় শ্রমিক শক্তির যুগ্ম আহ্বায়ক সজিব ওয়াহিদ উপস্থিত ছিলেন। নেতারা জানান, তারা পরিসংখ্যাননির্ভর নামসর্বস্ব কোনো বাজেট চান না; বরং এমন একটি বাজেট চান যা অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও মানুষের জীবনমান উন্নত করবে।






