মাদক, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়তে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়; এ জন্য দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সদর মডেল থানার আয়োজিত মাদকবিরোধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, সমাজ ও পরিবারের শান্তি নিশ্চিত করতে হলে আগে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হবে। সীমান্তপথে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে পুলিশ, বিজিবি, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
তরুণদের মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এমপি শ্যামল বলেন, অভিভাবকদের সন্তানদের চলাফেরার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
শিক্ষার্থীরা যেন সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে বাইরে অবস্থান না করে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের বিষয়ে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
মাদক নির্মূলে আইনজীবীদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, মাদক মামলার আসামিদের সহজে জামিনের সুযোগ কমানো গেলে মাদক নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল আসবে। নতুন আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে একটি মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তোলার আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি।
সমাবেশে বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাইনুল ইসলাম চপলের সঞ্চালনায় সভাপতির বক্তব্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ বলেন, মাদক, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাস নির্মূলে শুধু পুলিশের অভিযান যথেষ্ট নয়। পরিবারের সচেতনতা ও সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এ সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও অপরাধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে পরিবার, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে এবং এ কাজে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম বলেন, মাদকাসক্তদের শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে চলবে না; তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি রিহ্যাবিলিটেশন ও নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব খাটিয়ে কেউ যেন মাদক ব্যবসা চালাতে না পারে, সে বিষয়েও সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
জামায়াতে ইসলামীর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আমির মাওলানা মোবারক হোসাইন বলেন, সব ধর্মেই মাদক সেবন ও ব্যবসা নিষিদ্ধ। তিনি মাদককে সমাজের জন্য ভয়াবহ অভিশাপ উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন র্যাব-৯-এর কোম্পানি কমান্ডার মো. নুরুন্নবী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাজেদুল হাসান, এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আনাউল্লাহ, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলাম, সিনিয়র সহসভাপতি জহিরুল ইসলাম খোকন, সাবেক পৌর মেয়র ও জেলা বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মোঃ জসিম উদ্দিন রিপন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মনির হোসেন, ঐক্যবদ্ধ সদর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিচালক আরিফ বিল্লাহ আজিজী এবং ‘মাদকমুক্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া চাই’ সংগঠনের মাহফুজুর রহমান পুষ্পসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
বক্তারা বলেন, সীমান্তপথে মাদক প্রবেশ বন্ধ, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, পরিবারে সন্তানদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং প্রতিটি মহল্লায় কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি গঠন—এই ছয়টি উদ্যোগ বাস্তবায়ন ছাড়া মাদকমুক্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া গড়ে তোলা সম্ভব নয়।






