মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীরা লক্ষাধিক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করে মহান স্বাধীনতার ইতিহাস ও চেতনাকে কলঙ্কিত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।
তিনি বলেন, প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়নে কাজ করছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
বুধবার (১২ আগস্ট) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রামাণ্য, তথ্যনির্ভর, নির্মোহ ও সর্বজনগ্রাহ্য ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের প্রকৃত ও নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের কৌশল ও করণীয় নির্ধারণে এ সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। এতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের তালিকা প্রণয়নে আবেগ, অনুমান কিংবা বিচ্ছিন্ন তথ্যের পরিবর্তে প্রামাণ্য দলিল, সরকারি ও সামরিক নথি, মুক্তিযুদ্ধকালীন রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য এবং গবেষণালব্ধ উপাত্তের সমন্বিত ও বহুমাত্রিক যাচাই নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আলোচকরা বলেন, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সাক্ষ্য দ্রুত সংরক্ষণ করা জরুরি। একই সঙ্গে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী, প্রশাসন, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে।
তারা তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জ্ঞান ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের সঙ্গে সমন্বয়, বিদ্যমান নথির পুনঃযাচাই এবং তথ্যের উৎস ও যাচাই প্রক্রিয়া সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন।
সভায় বক্তারা শহীদদের তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রেও সমন্বিত ও বিস্তৃত পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান জানান। রণাঙ্গনে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে নিহত সাধারণ মানুষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বুদ্ধিজীবী, নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের তথ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ, যাচাই ও সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে সশস্ত্র অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তর জাতীয় অংশগ্রহণের ইতিহাসও যথাযথভাবে নথিভুক্ত করার কথা বলেন বক্তারা।
তারা বলেন, একটি নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের পাশাপাশি প্রত্যেক নামের অন্তর্ভুক্তির পেছনে থাকা দলিল, সাক্ষ্য, তথ্যের উৎস ও যাচাইয়ের ভিত্তি সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আরও নির্ভরযোগ্য ও গবেষণোপযোগী হয়ে উঠবে।
সভাপতির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের গৌরব, জাতীয় আত্মপরিচয় এবং জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই মহান অর্জনের ইতিহাসকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ, প্রামাণ্যভাবে উপস্থাপন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নির্ভুলভাবে পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব।’
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অনিয়ম ও অমুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ রয়েছে। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এ অবস্থার অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন এবং একই সঙ্গে শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের একটি নির্ভুল তালিকা প্রস্তুতের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় কাজ করছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরব, আমাদের পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এটাকে কলঙ্কমুক্ত করা আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য, জাতি হিসেবে।’
তিনি বলেন, এ কাজে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ইতিহাসবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা হবে।
‘কীভাবে আমরা সঠিক ও নির্মোহভাবে মুক্তিযুদ্ধের তালিকা তৈরি করে জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পারি এবং লিপিবদ্ধ করতে পারি, আমরা আপনাদেরসহ পুরো জাতির সব পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে চাই’ বলেন তিনি
শহীদদের সংখ্যা ও পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তি সুস্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীনতার অব্যবহিত পরবর্তী সময়ে দেশের প্রশাসনিক কাঠামো স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না। কোনো তথ্য উপাত্ত ছাড়া অনুমানের ওপর শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা এবং বীরাঙ্গনাদের সংখ্যা ঘোষণা করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার দীর্ঘ কয়েক দশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীরা লক্ষাধিক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করে মহান স্বাধীনতার ইতিহাস এবং চেতনাকে কলঙ্কিত করেছে। তা থেকে মুক্তি দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বীরাঙ্গনার সঠিক তালিকা প্রস্তুত করে স্বাধীন বাংলাদেশকে সঠিক ধারায় পৌঁছে দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ।’
মন্ত্রী বলেন, ‘সঠিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, শহীদদের তালিকা ও বীরাঙ্গনাদের তালিকা উপস্থাপন করতে পারলেই ইতিহাসবিদদের কাছে ইতিহাস রচনার জন্য প্রামাণ্য তথ্য তুলে দেওয়া সম্ভব হবে। নইলে আমরাই ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যাব।’
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, শুধু দ্বিতীয় পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে নয়, বরং সভায় উপস্থিত বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও বিদগ্ধ বক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্য ভবিষ্যতে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং বীরাঙ্গনাদের প্রকৃত তালিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সভায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলম বীর প্রতীক, বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ড. আবদুল হাই সিদ্দিক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জামিল ডি আহসান বীর প্রতীক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আজিজুর রহমান বীর উত্তম, সিপিবির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মঞ্জুরুল আহসান খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক আহমেদ খান, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, বীর মুক্তিযোদ্ধা নইম জাহাঙ্গীরসহ অন্যান্য বিশিষ্টজন বক্তব্য দেন।
বার্তা বাজার/ আইকে






