স্ত্রী-সন্তান, শ্বশুরসহ ভারতের কলকাতা থেকে বুধবার দেশে ফেরার কথা ছিল কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের। আগের রাতে মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে তার কথা হয়। মা-বাবা আর তাদের কাছে রেখে যাওয়া ৮ বছরের মেয়ের জন্য কত কেনাকাটা করেছেন, সেগুলো দেখিয়েছিলেন। তখন মিটিমিটি হাসছিলেন। এসব কথা বলেন মা স্বপ্না দত্ত আর কাঁদেন। কে জানত, তার স্নেহের দেবার সঙ্গে এই তাঁর শেষ দেখা, শেষ কথা! দেশে ফিরে আসবে তাঁর ছেলে, ছেলের বউ, নাতি ও বেয়াইয়ের মরদেহ।
মঙ্গলবার গভীর রাত ২টার দিকে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ আগুনে শ্বাসরোধে যে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে; তাদের মধ্যে সাতজনই বাংলাদেশি। এর মধ্যে সবার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। সাতজনের চারজনই একই পরিবারের। তাঁরা হলেন-দেবাশীষ দত্ত (৩৮) ছিলেন জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইন-এর কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি এবং স্থানীয় দৈনিক আজকের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। অগ্নিকাণ্ডে দেবাশীষ দত্তের আড়াই বছরের ছেলে শর্ণশীষ দত্ত, স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৭) ও তাঁর শ্বশুর আকরাম আলীরও (৬৫) মৃত্যু হয়। অন্যজন হলেন সাভারের আমিনবাজারের বেগুনবাড়ি এলাকার আহম্মেদ বাবু (৩৭)। তিনি ব্যবসার কাজে কলকাতা গিয়েছিলেন। সাতক্ষীরা কালীগঞ্জের রেবাতি সরকার ও এস এম আলীমুজ্জামান।
এছাড়া ভারতীয় দুইজন হলেন- ঝারখান্ডের স্বন্দীপ পাসওয়ার ও শিলিগুড়ির নারায়াণ আগারওয়াল।
কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার একটি ভাড়া বাসায় সপরিবারে থাকতেন দেবাশীষ। গতকাল বেলা ২টায় আড়ুয়াপাড়ার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, মা স্বপ্না দত্ত বিলাপ করে বারবার বলছেন তাঁর দেবাকে ফিরিয়ে এনে দিতে। স্বজনরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। দেবাশীষের বড় মেয়ে দিবানীতা (৮) ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। চোখ ছলছল। কোনো কথা বলছে না সে। তবে বুঝতে পেরেছে, মা-বাবা আর তার আদরের ভাইটি নেই।
দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার জানান, সকালে টিভিতে খবর দেখেন– কলকাতায় হোটেলে ভয়াবহ আগুন লেগেছে। এতে যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে সাতজনই বাংলাদেশি। অজানা আশঙ্কায় তাঁর বুক ছাঁৎ করে ওঠে। ছেলের নম্বরে বারবার কল দেন। রিং হয়, কিন্তু কেউ ধরে না। এতে দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যায়। পরে জানতে পারেন, তাঁর ছেলে, ছেলের বউ, নাতি ও বেয়াই মারা গেছেন।
একমাত্র উপর্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন দিলীপ কুমার। তিনি বলেন, ‘দেবাশীষ আমার একমাত্র সন্তান। সে পরিবারের খরচ চালাত। আমাদের আয়ের একমাত্র অবলম্বন ছিল সে। প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকার ওষুধ লাগে আমার ও তার মায়ের। এখন পরিবার কীভাবে চলবে! ওর মেয়েটা মা-বাবা ও ভাইহারা হয়ে গেল। ওকে আমরা কী বলে সান্ত্বনা দেব? কেমন করে বড় করব!’
দেবাশীষের ভায়রা ভাই ফিরোজ হোসেন বলেন, ‘স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে দেবাশীষ ৩ আগস্ট কলকাতা গিয়েছিলেন। সেখান থেকে যান কর্ণাটকের বেঙ্গালুরু। আমি ও আমার শ্বশুর আকরাম হোসেনও চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরু গিয়েছিলাম। চিকিৎসা শেষে আমি গত সোমবার দেশে ফিরে আসি। আমার শ্বশুর থেকে যান দেবাশীষের সঙ্গে। আজ (গতকাল) বুধবার তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল।’
ফিরোজ হোসেন আরও বলেন, ‘সকালে অনেকবার দেবাশীষের মোবাইলে কল করলেও কেউ সাড়া দেননি। পরে দূতাবাসের একজন ফোন রিসিভ করেন। তখনই মর্মান্তিক খবরটি জানতে পারি। আমি কলকাতায় যাচ্ছি মরদেহ গ্রহণ করার জন্য। সব প্রক্রিয়া শেষ করে কাল (আজ বৃহস্পতিবার) হয়তো মরদেহগুলো নিয়ে ফিরতে পারব।’
জানা গেছে, দেবাশীষের আত্মীয় ভারতের মালদহের বাসিন্দা কৃষ্ণ নন্দী ব্যবসার কাজে কলকাতাতেই ছিলেন। বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিউমার্কেট থানায় যান। পরে মর্গে গিয়ে দেবাশীষদের মরদেহ শনাক্ত করেন।
কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার ৪ তলা বাসার দোতলায় ভাড়া থাকতেন দেবাশীষ। বিকেল ৪টার দিকে আরেকবার গিয়ে দেখা যায় সংবাদকর্মীর ভিড়। অনেকেই লাইভ করছেন। প্রিয় সংবাদকর্মীকে নিয়ে এমন সংবাদ পড়তে হবে কিংবা লিখতে হবে, সেটা অনেকে কল্পনায়ও আনতে পারেননি।
কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আন্দোলনের বাজার পত্রিকার সম্পাদক আনিসুজ্জামান ডাবলু বলেন, ‘দেবাশীষ ছিল সবার প্রিয় একজন মানুষ। সে আপাদমস্তক সাংবাদিক ছিল। তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল সংবাদ নিয়ে। ভারতে যাওয়ার আগের দিনও আমার অফিসে এসেছিল। সকালে টেলিভিশন খুলে খবর দেখছিলাম– কলকাতায় হোটেলে আগুনে বাংলাদেশের সাতজন মারা গেছে। এর মধ্যে দেবাশীষও ছিল– এটা মানতে পারছি না। ওর হাসিমাখা মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।’






