পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় সরবরাহ করা প্যাকেটজাত ইউএইচটি তরল দুধে জ্যান্ত পোকা পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিন উপজেলার দেবীডুবা-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টির সত্যতা মেলে।
এর আগে গতকাল সোমবার (৩১ আগস্ট) ওই বিদ্যালয় থেকে পাওয়া দুধের প্যাকেট বাড়িতে খুলে জ্যান্ত পোকা দেখতে পায় এক শিক্ষার্থী। পরে পোকা পাওয়ার সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ওই দিন শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু মোনালিসাকে ছুটির সময় প্যাকেটজাত দুধ ও বনরুটি দেওয়া হয়। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হওয়ায় মোনালিসা দুধ ও বনরুটি বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে স্ট্র দিয়ে কিছুটা দুধ পান করার পর বনরুটি দুধে ভিজিয়ে খাওয়ার জন্য তার মা প্যাকেটটি কেটে একটি বাটিতে দুধ ঢালেন। এ সময় দুধের মধ্যে জ্যান্ত পোকা দেখতে পান তিনি।
মোনালিসার বাবা মোশারফ বলেন, ‘এর আগে কখনো এমন সমস্যা হয়নি। গতকাল বিদ্যালয় থেকে দেওয়া দুধের প্যাকেটের অর্ধেক স্ট্র দিয়ে পান করার পর বাকি দুধ বাটিতে ঢালতে গিয়ে জীবন্ত পোকা দেখতে পাই। পরে দুধটি আবার প্যাকেটে ভরে বিদ্যালয়ে নিয়ে গিয়ে শিক্ষকদের বিষয়টি জানাই।’
মোনালিসার অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলার পর বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও কথা বলেন প্রতিবেদক। এ সময় প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাহমিদা ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নন্দিতা আগের দিন সরবরাহ করা দুধের প্যাকেটে পোকা পাওয়ার কথা জানায়। তবে তারা বিষয়টি শিক্ষকদের জানায়নি বলে জানায়।
বিদ্যালয়ে ওই দিন সরবরাহ করা ১৪০ ব্যাচের কয়েকটি দুধের প্যাকেট পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, সেগুলোতে উৎপাদনের তারিখ ২ আগস্ট এবং মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ১১ নভেম্বর উল্লেখ রয়েছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, দেবীগঞ্জ উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় দুধ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে রংপুর ডেইরী অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টস নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
বিষয়টি জানার পর বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাৎক্ষণিক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে এবং দুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রংপুর ডেইরী অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টস কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
এ বিষয়ে রংপুর ডেইরী অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টসের সহকারী ব্যবস্থাপক জাকারিয়া আনাম বলেন, ‘সারা দেশের বিদ্যালয়ে ইউএইচটি দুধ সরবরাহের কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহ করা দুধে মাঝেমধ্যে এ ধরনের সমস্যা হচ্ছে। আমরা শিক্ষকদের বারবার বলছি, তারা যেন শিশুদের দুধ পান করানোর আগে সামান্য স্বাদ দেখে নিতে বলেন। কোনো শিক্ষার্থীর দুধের প্যাকেট নষ্ট পাওয়া গেলে পরদিন তাকে দুধ দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় অতিরিক্ত চাপের কারণে প্যাকেটে মাইক্রো লিকেজ হতে পারে। এতে দুধের স্বাদ পরিবর্তন হয় এবং দীর্ঘ সময় গেলে ম্যাগোট জন্মাতে পারে।’
তবে বাণিজ্যিকভাবে প্যাকেটজাত দুধ উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দাবি, গরুর দুধ ১৩৫ থেকে ১৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্রায় চার সেকেন্ড উত্তপ্ত করে জীবাণুমুক্ত করার পর ছয় স্তরবিশিষ্ট টেট্রাপ্যাকের বিশেষ কার্টনে প্যাকেটজাত করা হয়। ইউএইচটি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত ও সঠিকভাবে সিল করা দুধে বাইরের বাতাস, আর্দ্রতা ও আলো প্রবেশের সুযোগ থাকে না। ফলে স্বাভাবিক তাপমাত্রায়ও এ ধরনের দুধ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব।
এ বিষয়ে দেবীডুবা (২) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রঞ্জন কুমার রায় বলেন, ‘গতকাল আমি ছুটিতে ছিলাম। তবে বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও রংপুর ডেইরী কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজীৎ সাহা বলেন, ‘ঘটনার বিষয়ে রংপুর ডেইরীকে সতর্ক করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষকদের খাবারের গুণগত মান যাচাই করে গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’






