ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের এক ছাত্রীকে ‘আপত্তিকর ও শ্লীলতাহানি’র ঘটনায় পলাতক রয়েছে অভিযুক্ত আসামী নুর ইসলাম। তিনি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের শাহেব আলি মুন্সীর সন্তান। পাশাপাশি শেখপাড়া রাহাতন নেছা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত আছেন। তাকে স্কুল এন্ড কলেজ থেকে সাময়িক বহিষ্কার করে স্থায়ী বহিষ্কারের জন্য তদন্ত করছে বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত আসামীকে গ্রেফতার নিয়ে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে গত ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর দেওয়া অভিযোগপত্রে ভুক্তভোগী ছাত্রী লিখেছিলেন, ওইদিন বেলা ১১ ঘটিকা হতে ১১ টা ১৫ মিনিটের মধ্যে কলা অনুষদের ৫ম তলায় ফোকলোর স্টাডিজ বিভাগের বাড়িডোরে তার সাথে আপত্তিকর ও যৌন হয়রানির মতো একটি ঘটনা ঘটে। উক্ত লোকটিকে সে (ভুক্তভোগী) ইতোপূর্বে দেখেননি এবং ঘটনাটি তাকে মানসিকভাবে অত্যন্ত বিব্রত ও আতঙ্কিত করেছে। ওইদিন ক্যাম্পাসে ঘটনাটি জানাজানি হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আলীনূর রহমানকে আহ্বায়ক এবং সদস্য সচিব সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহা. খাইরুল ইসলাম ও ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. ওবায়দুল ইসলামকে সদস্য বানিয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আলীনূর রহমান জানান, “ঘটনাটি তদন্ত করে গত সপ্তাহে রিপোর্ট জমা দিয়েছি। যদিও অনেকবার চেষ্টা করেও অভিযুক্তকে হাজির করাতে পারিনি। যা পেয়েছি তা দিয়েছি। বাকিটা প্রশাসন দেখবে।”
সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হলে আসামির পরিচয় পাওয়া যায়। তথ্য মতে— অভিযুক্ত আসামী নুর ইসলাম শেখপাড়া রাহাতন নেছা স্কুল এন্ড কলেজে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। এর আগে শৈলকূপা গোবিন্দপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি শৈলকূপা থানা ও ঝিনাইদহ জেলা বিএনপি’র সহ সভাপতি নজরুল জোয়ার্দারের অনুসারী ও যুবদল কর্মী বলে একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এদিকে রাহাতন নেছা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নৈতিক স্খলনের ঘটনা আগেও ঘটেছে। তাকে নিয়ে কয়েকবার বিদ্যালয়ে সালিশও হয়েছে। তখন শৈলকূপার বিএনপি নেতা নজরুল জোয়ার্দার জিম্মিদার হয়ে মীমাংসা করেছিলেন। শিক্ষকদের বিশ্বাস, এই ঘটনায় নজরুল জোয়ার্দার অভিযুক্তকে প্রশ্রয় দিবেন না।
তবে এলাকার সন্তান হিসেবে কয়েকটা ঘটনা মীমাংসার কথা স্বীকার করলেও এবার অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান শৈলকূপার বিএনপি নেতা নজরুল জোয়ার্দার। বিএনপি নেতা নজরুল জোয়ার্দার বলেন, “আমাকে নিয়ে কেউ কিছু অভিযোগ দিলে সেটা অনুমান নির্ভর। তথ্য ভিত্তিক কেউ অভিযোগ দিতে পারবে না। আমরা অন্যায়ের প্রশ্রয় দিই না।”
এদিকে ঝিনাইদহ শিক্ষা অফিসার মো. সুলতান আলীকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা অফিসার বলেন, “এই সপ্তাহে তদন্ত কাজ শেষ করবো। পরের সপ্তাহে রিপোর্ট জমা দিতে পারবো। এই ছেলের অতীত ভালো না সেটা অনেকেই অভিযোগ দিয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নাই।”
রাহাতন নেছা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ জানান, “আমরা তাকে সাময়িক বহিষ্কার করেছি। স্থায়ী বহিষ্কারের জন্য তদন্ত কমিটির কাজ চলছে। যেহেতু গার্লস স্কুল, এখানে নৈতিক স্খলনের কেউ পার পাবে না। প্রতিষ্ঠানের শাস্তি সেই পাবেই। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ তারা বুঝবে। মামলার বিষয়ে মন্তব্য করছি না।”
মামালা দায়ের:
গত ৩ জুলাই দুপুরে ইবি থানায় এজাহারভুক্ত করার মাধ্যমে মামলা রুজু করে বাবার উপস্থিতিতে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। মামলাটির তদন্তে দায়িত্বে ছিলেন ইবি থানার এসআই শ্রীবাস কুন্ডু। পরে এসআই শ্রীবাস কুন্ডু অন্যত্রে বদলি হলে এসআই নাছির উদ্দিন তদন্তের দায়িত্ব পালন করছেন। থানা সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী ছাত্রী তাঁর বাবার সঙ্গে থানায় উপস্থিত হয়ে ৩ নং মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারা (শ্লীলতাহানি) এজাহারভুক্ত করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, চিহ্নিত আসামী নুর ইসলামের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন সক্রিয় রয়েছে। তারপরও ধরাছোঁয়ার বাহিরে অবস্থান করছেন। মামলাটি প্রত্যাহার করার জন্যও তোড়জোড় চলছে বলে জানা গেছে।
মামলার অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই নাছির উদ্দিন জানান, আগের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি বদলি হওয়ায় আমাকে মামলার ফাইল বুঝিয়ে দিয়েছে। দেখে আপডেট জানাতে পারবো। আপাতত কোনো প্রভাব, গড়িমসি বা ধামাচাপার সুযোগ নাই।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশীদ বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হওয়ায় আরেকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমিও ইবি থানায় নতুন যয়েন হলাম। মামলাটি স্টাডি করে দেখতে হবে।






