চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ৩৬তম সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (৮ আগস্ট) অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট উপস্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, আবাসন, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক উন্নয়নে একাধিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
অধিবেশনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ও সিনেট সচিব মো. হাছান মিয়া বাজেট উপস্থাপন করেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৪২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা চাহিদার বিপরীতে ৪৮৯ কোটি ৯৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এতে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে ২৫২ কোটি ৯৮ লাখ ২১ হাজার টাকা।
অন্যদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯৭৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা চাহিদার বিপরীতে ৫০৩ কোটি ৪৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এ অর্থবছরে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে ৪৭১ কোটি ৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা।
বাজেট উপস্থাপনের সময় বলা হয়, ভর্তি পরীক্ষার ফরম বিক্রির আয় থেকে নির্ধারিত ৪০ শতাংশ তহবিলে জমা দিতে না পারা এবং জিপিএফ তহবিল থেকে ঋণের কারণে ব্যাংক লভ্যাংশ কমে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে ক্রমবর্ধমান ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত পুঞ্জীভূত ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৮৩ কোটি টাকা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে গবেষণা খাতে ইউজিসি থেকে পৃথক বরাদ্দ পাওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে ৬৭ কোটি ৭৩ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং টিএসসি নির্মাণ প্রকল্পে ১৪ কোটি ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার টাকার উন্নয়ন কর্মসূচি রাখা হয়েছে।
বাজেট নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মাসিক আয়-ব্যয়ের হিসাব মনিটরিং, অভ্যন্তরীণ আয় বৃদ্ধি, জিপিএফ তহবিলের অবশিষ্ট অর্থ যথাযথভাবে বিনিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রোগ্রাম বাজেটিং এবং সুষ্ঠুভাবে ডিপিপি বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার পরিকল্পনা
সিনেট অধিবেশনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানের এবং দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে একগুচ্ছ পরিকল্পনা তুলে ধরেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান।
পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ চবি শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন ও হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার পরিবারের সদস্যদের চাকরির ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব ও শতভাগ আবাসিক সবুজ ক্যাম্পাস গঠন, আধুনিক টিএসসি নির্মাণ, আন্তর্জাতিক মানের গেস্ট হাউস নির্মাণ এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে পৃথক রেললাইন স্থাপনের উদ্যোগ।
এছাড়া এআই ও ডাটা সায়েন্সের মতো যুগোপযোগী বিভাগ চালু, আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান উন্নত করা, মৌলিক গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি অনুদান এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাডেমিয়ার সম্পর্ক জোরদারের পরিকল্পনার কথাও জানান উপাচার্য।
উদ্ভাবন ও মেধাস্বত্ব সংরক্ষণে নতুন সেল গঠন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববৈচিত্র্যের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। গবেষণামুখী কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অংশীজনকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
ওবিই কারিকুলাম ও নতুন বিভাগ চালুর পরিকল্পনা
উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঙঁঃপড়সব-ইধংবফ ঊফঁপধঃরড়হ (ঙইঊ) কারিকুলাম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সেশনজট নিরসনে সুনির্দিষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
চাহিদা অনুযায়ী রোবোটিক্স, ডাটা সায়েন্স ও ক্লাইমেট চেঞ্জের মতো নতুন বিষয় চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অর্থায়নকৃত গবেষণার পরিধি বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ইউজিসির কাছে প্রায় ২৯ কোটি টাকার বাজেট চাহিদা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া কৃতী শিক্ষার্থীদের জন্য উপাচার্য ও ডিনস অ্যাওয়ার্ড চালু, ইনোভেশন হাব প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা সংস্কার এবং বছরব্যাপী সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির যৌথ সহযোগিতায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির আশাবাদও ব্যক্ত করেন।
৩০০০ কোটি টাকার আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের আওতায় উচ্চগতির ওয়াই-ফাই, আইওটি এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ হাজার সদস্যের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মেডিকেল সেন্টারের মানোন্নয়ন, ওষুধের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে আধুনিক চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলেও জানান উপ-উপাচার্য।
এ ছাড়া হলগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য মেডিকেল কর্নার স্থাপন ও সিকরুম বিয়ারারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছর পর মেধা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে আবাসিক হলের আসন বণ্টন শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভিস বিধি ও অর্থ বিধি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও গতিশীল, সুশাসিত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরে ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।






