ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রী হলগুলোতে প্রচলিত ‘সান্ধ্য আইন’ বাতিল, নারী শিক্ষার্থীদের ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং এক হল থেকে অন্য হলে প্রবেশের সুযোগসহ তিন দফা দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে শিক্ষার্থী প্ল্যাটফর্ম ‘অবরোধবাসিনী’। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে অবস্থান কর্মসূচিসহ কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত সংহতি সমাবেশ থেকে এ আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। সমাবেশে বক্তারা ছাত্রী হলের রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত প্রবেশ-নিষেধাজ্ঞাকে বৈষম্যমূলক ও নারীর স্বাধীন চলাচলের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে তা বাতিলের দাবি জানান। ‘সময়ের শেকল ভাঙার’ লড়াইয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সবাইকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
‘অবরোধবাসিনী’র তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—ছাত্রী হলে রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত প্রচলিত সান্ধ্য আইন বাতিল করে ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা; বৈধ পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে সব ছাত্রীকে যেকোনো ছাত্রী হলে প্রবেশ এবং অনুমতি নিয়ে রাতযাপনের সুযোগ দেওয়া; এবং ছাত্রীদের মা, বোনসহ নারী স্বজনদের হলে প্রবেশের অধিকার নিশ্চিত করা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১০৫ বছর পেরিয়ে গেলেও নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ঔপনিবেশিক আমলের বিধিনিষেধের আদলে রাতের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর একাধিকবার দাবি জানানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
‘অবরোধবাসিনী’র পক্ষ থেকে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। নিয়মিত হল ফি পরিশোধ করলেও অনাবাসিক ছাত্রীদের অনেক ক্ষেত্রে নিজ হলে প্রবেশের সুযোগ থাকে না। অন্যদিকে পুরুষ হলগুলোতে অতিথি প্রবেশের তুলনামূলক সহজ ব্যবস্থার বিপরীতে নারী শিক্ষার্থীদের মা-বোন কিংবা অন্য হলের ছাত্রীদের প্রবেশাধিকার সীমিত বা নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। তাদের দাবি, এতে নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ও বৈষম্যমূলক প্রশাসনিক নীতি বহাল রয়েছে।
বক্তারা আরও বলেন, নিরাপত্তার যুক্তিতে রাত ১০টার পর হলের প্রবেশ বন্ধ রাখা হলেও বাস্তবে দূরপাল্লার যাত্রা শেষে রাতে ক্যাম্পাসে ফেরা, জরুরি চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে নারী শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়। শিক্ষার্থীদের চলাচল সীমিত না করে ক্যাম্পাসে সার্বজনীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের দায়িত্ব বলে তারা মন্তব্য করেন।
সমাবেশে ‘অবরোধবাসিনী’র পক্ষে ইশরাত জাহান ইমু বলেন, ২০১৫ সালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে এক ছাত্রী অসুস্থ অবস্থায় প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমতি ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না পারায় চিকিৎসার অভাবে হলের ভেতরেই মারা যান বলে তারা দাবি করেন। এ ধরনের ঘটনা ছাত্রী হলের সান্ধ্য আইন ও জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক জটিলতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রশাসন যদি ছাত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব ১৬ ঘণ্টা নেওয়ার কথা বলে, তাহলে বাকি আট ঘণ্টা তাদের হলের মধ্যে থাকতে বাধ্য করা বৈষম্যমূলক। পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা চলাচলের সুযোগ থাকলেও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এমন বিধিনিষেধ লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের শামিল বলে দাবি করেন তিনি।
বিপ্লবী নারী মুক্তির পক্ষে তাসনিয়া নেবুলা বলেন, রাত ১০টায় হলের গেট বন্ধ করে দেওয়া কোনো কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়। শিক্ষার্থীদের চলাচল সীমিত না করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।নারীপক্ষের সদস্য শিবীন হক বলেন, প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে তারাও ছাত্রী হলের সান্ধ্য আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। তখন সন্ধ্যা ৬টার বিধিনিষেধ রাত ১০টা পর্যন্ত শিথিল করা হলেও বৈষম্যের অবসান হয়নি। বর্তমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে তিনি সমর্থন জানান।
আলোকচিত্রী ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের জান্নাতুল মাওয়া বলেন, ২০২৬ সালেও শুধু নারী হওয়ার কারণে চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ থাকা হতাশাজনক। লিঙ্গের ভিত্তিতে এমন বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ড. রুশাদ ফরিদী শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সেই বাংলাদেশেও নারীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী এমন বিধিনিষেধ বহাল থাকা শিক্ষক হিসেবে তাদের জন্য লজ্জার বিষয়। তিনি অবিলম্বে সান্ধ্য আইন বাতিলের দাবি জানান।
সমাবেশে রোকেয়া হল কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি সংসদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ, নারীপক্ষ, রেড ফেমিনিস্ট ব্লগ, নারী অঙ্গন, বিপ্লবী নারী মুক্তি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বিপ্লবী ছাত্র যুব-আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফোকলোর সোসাইটি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন (ঢাবি সংসদ), বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সংসদ ও স্বরধ্বনিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা সংহতি জানান।
‘অবরোধবাসিনী’ জানিয়েছে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ না এলে অবস্থান কর্মসূচিসহ পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।






