আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত পূরণে ডলারের বিনিময় হার আরও নমনীয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে বাজারে ডলারের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শর্ত মানায় আইএমএফ তাদের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে দুটি কিস্তিতে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার দিতে যাচ্ছে। এই অর্থ জুন মাসের মধ্যেই পাওয়ার কথা রয়েছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে এই ঋণ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তিন কিস্তিতে পেয়েছে ২৩১ কোটি ডলার। বাকি রয়েছে ২৩৯ কোটি ডলার। তবে চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড় দীর্ঘদিন ধরে আটকে ছিল শর্ত পূরণ না হওয়ায়। সরকার এক পর্যায়ে আশা করেছিল জুনে একসঙ্গে দুটি কিস্তির অর্থ পাওয়া যাবে, যদিও তাতেও ছিল অনিশ্চয়তা।
মূলত ডলারের বিনিময় হারের বিষয়ে বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে একমাস ধরে নানা আলোচনা চলেছে। এপ্রিলের শুরুতে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে, এরপর বৈঠক হয় ওয়াশিংটনেও। তবুও সমঝোতা হয়নি। অবশেষে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ভার্চুয়াল আলোচনায় দুই পক্ষ কিছুটা কাছাকাছি আসে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক নমনীয়তার বিষয়ে সম্মত হয়। একই সঙ্গে আইএমএফ কিছু শর্তে ছাড় দেয়।
‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতির বিস্তৃতি, বাড়তে পারে ডলারের সর্বোচ্চ দাম
বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ক্রলিং পেগ’ নামে পরিচিত একটি ব্যবস্থায় ডলারের দাম নির্ধারণ করে, যেখানে ১১৯ টাকার সাথে ২.৫% ওঠানামার সুযোগ রয়েছে। এতে ডলারের সর্বোচ্চ দাম ১২৩ টাকা পর্যন্ত ওঠে। নতুন চুক্তি অনুযায়ী, এই সীমা আরও বাড়িয়ে ৪-৫ শতাংশ করা হচ্ছে, যার ফলে ডলারের দাম ১২৫ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে।
ঋণ ছাড় ও আর্থিক খাত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিস্তির অর্থ ছাড়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আইএমএফ কর্মসূচির আওতায় আর্থিক খাত সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। তিনি বলেন, “এই সংস্কার কার্যক্রম দেশকে সঠিক অর্থনৈতিক পথে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।”
আজ (বুধবার) দুবাই থেকে ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফ ঋণ ছাড়ের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। একই সঙ্গে আইএমএফ-ও শিগগির এ বিষয়ে বিবৃতি দেবে বলে জানা গেছে।
রাজস্ব আদায়ে শর্ত, এনবিআর সংস্কারে উদ্যোগ
ঋণ ছাড়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো। এর অংশ হিসেবে এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) ভেঙে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে—একটি রাজস্ব নীতিনির্ধারণে এবং অন্যটি কর আদায়ে দায়িত্ব পালন করবে।
ডলারের বাজার স্থিতিশীল, রেমিট্যান্স বাড়ছে
বর্তমানে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে হুন্ডি কমে আসায় বৈধ পথে প্রবাসী আয় বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১০.৫ মাসে দেশে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা অতীতের যেকোনো বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ।
এ ছাড়া মার্চ-এপ্রিল মেয়াদে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ১৮৮ কোটি ডলার পরিশোধের পরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রয়েছে। সামগ্রিকভাবে রিজার্ভ ও ডলারের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল।
অর্থনীতিবিদদের মত
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, “এই মুহূর্তে বিনিময় হার নমনীয় করার সিদ্ধান্ত সময়োচিত। আইএমএফের অর্থ ছাড়ে শুধু এই সংস্থার নয়, অন্যান্য দাতা সংস্থার অর্থ প্রবাহও চালু থাকবে, যা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিনিময় হার নির্ধারণ করে। বাংলাদেশকেও সেই পথে হাঁটতে হবে—ভয়ের পরিবেশ তৈরি না করে বরং বাজারে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিনিময় হারকে ব্যালান্স করা দরকার।”





