বাংলাদেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহারের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ পাচারের তথ্য প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাদের মতে, এই খাতের শিথিল নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির ঘাটতির কারণে প্রতিনিয়ত অপব্যবহার বেড়েই চলেছে।
টিআইবির সর্বশেষ গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০২২ সালে এমএফএস প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রায় ৭৮০ কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। এই পাচারের পেছনে মূলত হুন্ডি, ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা, অনলাইন জুয়া এবং বেআইনি বেটিংয়ের মতো কার্যক্রমকে দায়ী করা হয়েছে।
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত এমএফএস ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৬.৩ শতাংশ, এজেন্টদের মধ্যে ১৭ শতাংশ এবং মার্চেন্টদের ১.৬ শতাংশ জালিয়াতির শিকার হয়েছেন। এই প্রতারণার ফলে ক্ষতির পরিমাণও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ব্যক্তিগত হিসাবধারীরা ৩০০ থেকে ৮৩ হাজার টাকা, এজেন্টরা ২০০ থেকে ৩ লাখ ৭৬ হাজার টাকা এবং মার্চেন্টরা ৫৩ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, নগদ লিমিটেড ও থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেড সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান ট্রাস্ট ফান্ডের সীমা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি তৈরি করেছে। এই বিধিলঙ্ঘন গ্রাহকদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পাশাপাশি সুরক্ষা ভাতা ও উপবৃত্তি বিতরণে প্রভাব বিস্তার, প্ল্যাটফর্ম ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, এবং অবৈধ আন্তর্জাতিক লেনদেনে জড়িত থাকার বিষয়ও তদন্তে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে নগদ লিমিটেডের বেনামি শেয়ারহোল্ডারদের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হওয়ার তথ্য গবেষণায় উঠে আসে, যা গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে।
এমএফএস ব্যবহারের খরচ নিয়েও তুলনা করে টিআইবি জানায়, বাংলাদেশে এই খাতে গ্রাহকদের গড়ে ৬.৯ থেকে ১৫.৯ গুণ বেশি মাশুল দিতে হয়, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ২৫ হাজার টাকা উত্তোলনে বিকাশের চার্জ পড়ে ৩৭২ থেকে ৪৬২ টাকা, যেখানে পাকিস্তানে ইজি পেসা চার্জ করে ৩৫৫ টাকা এবং মিয়ানমারে ওয়েভ পে মাত্র ২৩১ টাকা। ভারতের ফোন পে’র মতো প্ল্যাটফর্মে আবার এই সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
টিআইবির মতে, এই খাতে ভোক্তা স্বার্থ উপেক্ষিত, প্রতারণার হার আশঙ্কাজনক, এবং আইনি কাঠামোর দুর্বলতার কারণে একটি একচেটিয়া বাজার গড়ে উঠেছে। বিকাশ ও নগদ মিলে ব্যক্তিগত হিসাবধারীদের প্রায় ১১৫ শতাংশ বাজার দখলে রয়েছে, যা প্রতিযোগিতা ও গ্রাহক সেবার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক মন্তব্য করেন, এক সময় সরাসরি ঘুষ লেনদেনের যে প্রবণতা ছিল, এখন তা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এমএফএস ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে দুর্নীতির নতুন পথ তৈরি হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অবৈধ হুন্ডি লেনদেন কমে আসায় প্রবাসী আয় বেড়েছে—এমন পর্যবেক্ষণও উঠে আসে।
সবশেষে, এমএফএস খাতকে আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে জবাবদিহি, সুশাসন ও গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে টিআইবি। তাদের ১৩ দফা সুপারিশের মধ্যে রয়েছে:
- এমএফএসের জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন
- স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি
- সেবার মূল্য নির্ধারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ
- আন্তর্জাতিক মান অনুসারে ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা
এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি নীতিনির্ধারকদের দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করবে বলে আশাবাদী টিআইবি।





