বিশ্বনেতাদের আমরা সাধারণত গম্ভীর ও দায়িত্বশীল হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতি নির্ধারণ আর কূটনৈতিক আলোচনায় নিমগ্ন দেখি। কিন্তু রাজনীতিতে প্রবেশের আগের তাদের জীবন ছিল একেবারে ভিন্ন। কেউ ছিলেন সংগীতপ্রেমী, কেউ ক্রীড়াবিদ, আবার কেউবা রঙ্গমঞ্চের অভিনেতা। এসব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাদের মানবিক দিকটিকে তুলে ধরে। যেখানে ক্ষমতার চেয়ে বেশি ফুটে ওঠে তাদের ব্যক্তিত্ব ও সৃষ্টিশীলতা।
রাজনীতি তাদের পরিচিত করেছে ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রতীকে। কিন্তু এসব গল্প মনে করিয়ে দেয় যে, বিশ্বনেতারাও এক সময় সাধারণ মানুষের মতোই স্বপ্ন দেখেছেন, সুর তুলেছেন, বা খেলাধুলায় মন দিয়েছেন। তাদের এই অজানা প্রতিভা ও অতীতের গল্পগুলো বলে দেয়, ক্ষমতার আসনে বসার আগে তারাও একসময় ছিলেন আমাদের মতোই একেকজন স্বপ্নবাজ মানুষ।
জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি: হেভি মেটাল ড্রামার
জাপানের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি একসময় ছিলেন হেভি মেটাল সংগীতের অনুরাগী ও দক্ষ ড্রামার। তরুণ বয়সে তিনি পিয়ানো বাজাতেন এবং মোটরসাইকেলের প্রতিও ছিল গভীর আগ্রহ। তার কাছে ছিল কাওয়াসাকি জি৪০০জিপি মোটরসাইকেল। তবে ১৯৯৩ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে প্রিয় বাইকটি বিক্রি করে দেন বলে সিএনএন জানিয়েছে।
মনমোহন সিং: অধ্যাপক থেকে প্রধানমন্ত্রী
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং রাজনীতিতে আসার আগেই প্রতিষ্ঠিত ছিলেন অর্থনীতিবিদ হিসেবে। দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিকসে অধ্যাপক হিসেবে তিনি দেশ-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেন। পরে অর্থনীতির জ্ঞান ও সততার জন্য তিনি দশ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এহুদ বারাক: সৈনিক থেকে প্রধানমন্ত্রী
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক দেশের সবচেয়ে বেশি পদকপ্রাপ্ত সৈনিক হিসেবে পরিচিত। ৩৫ বছর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন তিনি, নেতৃত্ব দিয়েছেন অভিজাত বাহিনী সায়েরেত মাতকালকে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত ছিলেন সেনাপ্রধান। পরে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি।
ইমরান খান: ক্রিকেট মাঠ থেকে রাজনীতির শীর্ষে
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান একসময় ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তারকা। ১৯৯২ সালে তার নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে। সেই অলরাউন্ডার পরবর্তীতে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দল গঠন করে রাজনীতিতে আসেন এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী হন।
অ্যাঞ্জেলা মেরকেল: রসায়নবিদ থেকে ইউরোপের ‘আয়রন লেডি’
জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মেরকেল রাজনীতিতে আসার আগে ছিলেন একজন বিজ্ঞানী। ১৯৮৬ সালে কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর পূর্ব বার্লিনের সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট ফর ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রিতে গবেষক হিসেবে কাজ করতেন। বিজ্ঞানমনস্ক এই নারীই পরবর্তীতে ইউরোপীয় রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠেন।
ভলোদিমির জেলেনস্কি: কৌতুকাভিনেতা থেকে প্রেসিডেন্ট
ইউক্রেনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাজনীতিতে আসার আগে ছিলেন কৌতুকাভিনেতা ও টেলিভিশন প্রযোজক। তিনি কোয়ার্টাল ৯৫ নামে একটি প্রযোজনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন এবং জনপ্রিয় টিভি সিরিজ সারভেন্ট অব দ্য পিপল-এ (২০১৫–২০১৯) অভিনয় করেন। এতে তিনি একজন সাধারণ শিক্ষক থেকে হঠাৎ প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠেন। কয়েক বছর পর সেই কল্পনা বাস্তব রূপ নেয়।
উইনস্টন চার্চিল: রাজনীতির আড়ালে চিত্রশিল্পী
ব্রিটেনের কিংবদন্তি নেতা উইনস্টন চার্চিল রাজনীতির চাপ সামলাতে হাতিয়ার করেছিলেন তুলি ও রঙ। ৪০ বছর বয়সে চিত্রাঙ্কন শুরু করেন তিনি। যা পরিণত হয় আত্মচিকিৎসার মাধ্যম হিসেবে। পরবর্তী চার দশকে ৫০০-রও বেশি ছবি আঁকেন চার্চিল। রাজনীতির উত্থান-পতন ও উত্তেজনার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন মানসিক প্রশান্তি।
জো বাইডেন: তরুণ বয়সে লাইফগার্ড
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রথম চাকরি ছিল লাইফগার্ড হিসেবে। ১৯৬২ সালের গ্রীষ্মে তিনি ডেলাওয়ারের প্রাইসেস রান পুলে কাজ করেন। ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাইডেন বলেন, এই কাজ তাকে দায়িত্ববোধ ও সামাজিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে বাস্তব শিক্ষা দিয়েছিল।
ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ: নাট্যচর্চা ও প্রেমের গল্প
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কিশোর বয়স কেটেছে নাটক ও কবিতার অনুশীলনে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি প্রেমে পড়েন তার ৩৯ বছর বয়সী নাটকের শিক্ষক ব্রিজিত ট্রোনিউর প্রেমে। স্কুল নাটকে একসঙ্গে কাজ করেই শুরু সেই সম্পর্ক, যা ২০০৭ সালে পরিণতি পায় বিয়েতে।
বারাক ওবামা: আইসক্রিম দোকানের কর্মচারী
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রথম চাকরি ছিল হাওয়াইয়ের একটি বাস্কিন-রবিন্স আইসক্রিম দোকানে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে সেখানে কাজ শুরু করেন তিনি। ওবামা পরবর্তীতে বলেন, এই কাজ আমাকে শিখিয়েছে দায়িত্ব, কঠোর পরিশ্রম আর সময়ের সঠিক ব্যবহার।
ভ্লাদিমির পুতিন: গুপ্তচর ও জুডোকা
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ১৫ বছর সোভিয়েত ইউনিয়নের গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিতে কর্মরত ছিলেন। জার্মানির ড্রেসডেনে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ জুডোকা ও সাম্বো খেলোয়াড়। ছোটবেলা থেকেই প্রশিক্ষণ নিয়ে অর্জন করেছেন ব্ল্যাক বেল্ট।
সূত্র: এনডিটিভি





