ঢাকা   শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

ভোট নেওয়ার সময় ছিলাম ভারতীয়, এখন হয়ে গেলাম বাংলাদেশি: বিজেপি সরকারের বুলডোজার অভিযানে গৃহহীন বাসিন্দা

Authorরেডিও বার্তা ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম

ভোট নেওয়ার সময় ছিলাম ভারতীয়, এখন হয়ে গেলাম বাংলাদেশি: বিজেপি সরকারের বুলডোজার অভিযানে গৃহহীন বাসিন্দা

মুম্বাইয়ের বান্দ্রা স্টেশন সংলগ্ন গরিব নগর ও পাম্পাপুরা বস্তি এলাকায় রেলওয়ের এক বিশাল উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। গত ১৯ মে থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে শয়ে শয়ে ঘরবাড়ি, দোকানপাট এবং দুটি প্রাচীন মসজিদ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উচ্ছেদের সময় তাদের “বাংলাদেশী” এবং “রোহিঙ্গা” বলে কটূক্তি করা হয়েছে, অথচ তাদের কাছে কয়েক দশকের পুরনো ভারতীয় নাগরিকত্বের বৈধ নথিপত্র রয়েছে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, বান্দ্রা টার্মিনাসের সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অনুপ্রবেশ রোধে এই “অবৈধ দখলদারি বিরোধী” অভিযান চালানো হয়েছে। তবে কোনো আগাম পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করায় তীব্র দাবদাহের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন শত শত মুসলিম ও দলিত পরিবার। জুনের আসন্ন বর্ষার মুখে এই পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

পশ্চিম রেলওয়ের আরপিএফ এবং ভারী পুলিশ বাহিনী বুলডোজার নিয়ে গরিব নগরে আকস্মিক অভিযান শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দা ৬১ বছর বয়সী মোহাম্মদ আসিফ জানান, “এখানে প্রায় ৫০০-র বেশি বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে, যার মধ্যে কেবল ১৪০টি বাড়িকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ এত জোর খাটাত যে আমাদের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করারও সময় দেয়নি।”

পশ্চিম রেলওয়ের মুখ্য জনসংযোগ কর্মকর্তা বিনীত অভিষেক এই অভিযানকে অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে সরকারের “দ্রুততম পদক্ষেপ” বলে বর্ণনা করেছেন এবং জানান যে ২৩ মে পর্যন্ত এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া চলবে।

উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দাদের অনেকেই ক্ষোভ উগরে দিয়ে তাদের ভোটার আইডি ও রেশন কার্ড দেখান। ৫১ বছর বয়সী মুনাওয়ার শেখ বলেন, “আমার দাদা এই মহল্লাতেই মারা গেছেন। এখানকার অধিকাংশ বাড়ি ৫০ থেকে ৭৫ বছরের পুরনো। নির্বাচনের সময় আমরা বৈধ ভোটার থাকি, রাজনৈতিক দলগুলো ভোট চাইতে আসে। আর ভোট দেওয়া শেষ হতেই আমরা হঠাৎ রোহিঙ্গা হয়ে গেলাম?”

৮৫ বছরের বৃদ্ধা রুকসানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ৪০ বছর ধরে এখানে আছি। সরকার দারিদ্র্য দূর করছে না, গরিবদের দূর করছে।”

অভিযানে ‘মসজিদ-ই-ইনআম’ এবং ‘ফয়জানে মুস্তফা গরিব নগর মসজিদ’ নামের দুটি পুরনো মসজিদ সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন প্রথমে আশ্বস্ত করেছিল যে উপাসনালয়গুলোতে হাত দেওয়া হবে না। ২০ বছর বয়সী তবাসুম বলেন, “মসজিদ ভাঙার আগে কোরআন ও অন্যান্য পবিত্র জিনিস বের করার জন্য আমাদের মাত্র ১০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল।”

মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়, যা একপর্যায়ে পাথর ছুড়ে মারার ঘটনায় রূপ নেয়। এরপরই পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মম লাঠিচার্জ করে। নারী ও শিশুসহ বহু মানুষকে মারধর ও টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনায় পুলিশ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন বাসিন্দাকে আটক করেছে এবং হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক গুরুতর ধারায় মামলা দায়ের করেছে।

অভিযানের চতুর্থ দিনে গরিব নগরের পাশেই দলিত ও মুসলিম অধ্যুষিত ‘পাম্পাপুরা’ এলাকায় উচ্ছেদ চালানো হয়। সেখানেও প্রতিরোধের মুখে পুলিশ লাঠিচার্জ করে দলিত বাসিন্দাদের ধরে নিয়ে যায়। বাসিন্দাদের অভিযোগ, অভিযানে একটি আম্বেদকারবাদী সংগঠনের কার্যালয় ভেঙে ফেলার পাশাপাশি বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকরের ছবি ও মূর্তি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্তরা মূলধারার ভারতীয় গণমাধ্যমের ওপর তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এক ৬০ বছর বয়সী নারী জানান, “গণমাধ্যম আমাদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরার বদলে আমাদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে উপহাস করছে এবং আমাদের ঢালাওভাবে বাংলাদেশী বলে প্রচার করছে।”

বর্তমানে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায়, তীব্র গরমের মধ্যে বান্দ্রা স্টেশনের পাশে, ব্রিজের নিচে কিংবা ফুটপাতে দিন কাটাচ্ছেন এই শ্রমজীবী মানুষেরা, যাদের একটি বড় অংশ মুম্বাই শহরের সচল রাখার পেছনে দৈনিক শ্রম দেয়। এনজিও এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো কিছু খাবার ও পানি বিতরণ করলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ত্রাণ বা পুনর্বাসনের বার্তা মেলেনি।

 

বার্তা বাজার/এমএমএইচ

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!