ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় দুই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বাড়িতে আটকে রাখার অভিযোগে ভারতের আগ্রার এক বাবাকে ভর্ৎসনা করেছেন এলাহাবাদ হাইকোর্ট। একই সঙ্গে দুই বোনকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তাদের ২৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত বলেছেন, সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর শুধু তার ধর্মীয় বিশ্বাস বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বাবা-মায়ের পছন্দ না হওয়ার কারণে তাকে আটকে রাখার কোনো সাংবিধানিক অধিকার তাদের নেই।
৩৫ ও ২০ বছর বয়সী দুই বোন ২০২০ ও ২০২১ সালে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন বলে আদালতকে জানান। এরপর গত বছর তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে কলকাতায় চলে যান। পরে আগ্রা পুলিশ তাদের কলকাতা থেকে উদ্ধার করে এবং অপহরণ ও জোর করে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগে আরও অন্তত ১২ জনকে গ্রেফতার করে।
পুলিশ দুই বোনকে তাদের বাবার কাছে হস্তান্তর করেছিল বলে জানান তাদের আইনজীবী আলি বিন সাইফ। পরে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে দুই বোন অভিযোগ করেন, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কারণে তাদের বাবা বাড়িতে আটকে রেখেছিলেন এবং তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।
৬ আগস্ট দেওয়া রায়ে বিচারপতি সন্দীপ জৈনের একক বেঞ্চ বলেন, কোনো বাবা-মা তাদের প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের শুধু তাদের ধর্ম, বিশ্বাস বা ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে একমত না হওয়ার কারণে আটকে রাখতে পারেন না। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির স্বাধীনতা সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত।
দুই বোন আদালতকে জানান, তারা নিজেদের ইচ্ছায় এবং সচেতনভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তাদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো প্রলোভন, প্রভাব, জোরজবরদস্তি, চাপ বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।
তাদের আরও অভিযোগ, বাবা তাদের জোর করে বাড়িতে আটকে রাখেন এবং ধর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে হিন্দুধর্মে ফিরে যেতে চাপ দেন। এ সময় ভয় দেখানো এবং দীর্ঘদিন মানসিক হয়রানি করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
দুই বোন আরও জানান, তাদের পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদ, পরিচয়পত্র, ব্যাংকের পাসবুক, চেকবুক, ধর্ম পরিবর্তন সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাবা নিজের কাছে নিয়ে রেখেছিলেন।
বড় বোন এমএসসি, এমফিল ও বিএড ডিগ্রিধারী। ছোট বোন দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন।
তাদের আইনজীবী আলি বিন সাইফ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে জানান, ২০২১ সালে বাবা মেয়েদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর গত বছর তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের আটকে রাখা হয়েছিল।
অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশ সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল আদালতে দাবি করেন, দুই নারীর ধর্ম পরিবর্তন একটি বড় ও সংঘবদ্ধ ষড়যন্ত্রের অংশ, যার দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও ঐক্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।
তদন্তকারীরাও দাবি করেন, বেআইনি ধর্মান্তরের মাধ্যমে দেশের সামাজিক কাঠামো নষ্ট করার পরিকল্পনার সঙ্গে কিছু ব্যক্তি জড়িত থাকার তথ্য তারা পেয়েছেন। এমনকি বিদেশি সংস্থা ও বাইরের প্রভাবেরও সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়।
তবে দুই বোনের আইনজীবী এই আশঙ্কাকে সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর বলে দাবি করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দুই প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নিজের ইচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তন কীভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব বা অখণ্ডতার জন্য হুমকি হতে পারে?
সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর হাইকোর্ট উত্তরপ্রদেশ সরকারের এই দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। আদালত বলেন, দুই নারীর ইসলাম গ্রহণকে দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও ঐক্যের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে—এমন বড় কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখার মতো যথেষ্ট ভিত্তি আদালত পাচ্ছে না।
আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, দুই বোনের বক্তব্য ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, সুসংগত ও স্পষ্ট। তারা জোরজবরদস্তি, ভয়, প্রলোভন বা অযাচিত প্রভাবের কারণে ধর্ম পরিবর্তন করেছেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিচারপতি সন্দীপ জৈন বলেন, নিজেদের পছন্দের ধর্ম গ্রহণ করার কারণে দুই প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে জোর করে আটকে রাখা আইনের শাসনের প্রতি গুরুতর অবমাননা এবং ভারতের সংবিধানের ২১ ও ২৫ অনুচ্ছেদে দেওয়া মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।
আদালত একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। আদালত বলেন, নাগরিকের জীবন ও স্বাধীনতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু দুই নারীকে বেআইনি আটকে রাখার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের মুক্ত করার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ওই আটকাবস্থা চলতে দিয়েছে।
আদালতের মতে, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দুই নারীর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রকেও দায়ী হতে হবে।
শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট দুই বোনকে অবিলম্বে মুক্ত করে তাদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বাবা ও উত্তরপ্রদেশ সরকারকে যৌথভাবে দুই বোনকে ২৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, মূল মামলার তদন্ত আইন অনুযায়ী চলবে। এই মামলার শুনানিতে আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, তদন্তে তার কোনো প্রভাব পড়বে না।
আদালত আরও জানিয়েছে, সরকার চাইলে ক্ষতিপূরণের ৫০ শতাংশ অর্থ বাবার কাছ থেকে এবং বাকি ৫০ শতাংশ এমন কোনো সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে আদায় করতে পারবে, যার কাজ বা নিষ্ক্রিয়তার কারণে দুই নারীর স্বাধীনতা অসাংবিধানিকভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।






