ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ফ্লোরেস অঞ্চলে আবারও ভূমিকম্প হয়েছে। সোমবার আঘাত হানা ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৯। এর কয়েক দিন আগে শক্তিশালী ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ৫৩ জন নিহত হন। ওই ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও হয়।
জার্মানির জিএফজেড রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস জানিয়েছে, সোমবারের ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। নতুন এই ভূমিকম্পে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন করে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
এর আগে শনিবার সকালে পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল এন্দে শহরের প্রায় ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে।
শক্তিশালী ওই ভূমিকম্পের পর সুনামির সতর্কতা জারি করা হয়। উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে ও উঁচু এলাকায় সরে যেতে বলা হয়। পরে সমুদ্রপৃষ্ঠে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা না যাওয়ায় সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।
নিহত ৫৩, আহত ১৩০-এর বেশি
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, শনিবার উদ্ধারকারীরা ৪৭ জনের লাশ উদ্ধার করেন। তাদের বেশির ভাগই সিক্কা, মাংগারাই ও পূর্ব মাংগারাই এলাকার বাসিন্দা। রোববার আরো ছয়জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩।
ভূমিকম্পে আহত হয়েছেন ১৩০ জনের বেশি।
আফটারশকের আশঙ্কায় হাজারো মানুষ রাত কাটিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে। শুরুতে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ভূমিকম্পের পর ২৩০টির বেশি আফটারশক হয়েছে। পরে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানায়, অন্তত ৯৯৫টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬টি মানুষ অনুভব করতে পেরেছেন। সবচেয়ে শক্তিশালী আফটারশকটির মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ২।
পূর্ব নুসা তেংগারাজুড়ে ৯০০টির বেশি বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। আরো প্রায় ৪৫০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়েছে। ফ্লোরেস অঞ্চলে অন্তত ২৪১টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভূমিকম্পে স্কুল, চিকিৎসাকেন্দ্র ও গির্জাসহ ১০০টির বেশি সরকারি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
ভূমিধসে উদ্ধারকাজ ব্যাহত
পূর্ব নুসা তেংগারা পুলিশের প্রধান রুদি দারমোকো জানান, ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং অনেক ভবন ধসে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।
দারমোকো বলেন, ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। তবে যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় তথ্য সংগ্রহে সমস্যা হচ্ছে।
ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট ভূমিধসে এন্দে রিজেন্সির ট্রান্স-ফ্লোরেস মহাসড়কের কয়েকটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রায় ৪৩৫ মাইল দীর্ঘ এই সড়কটি ফ্লোরেস দ্বীপের লাবুয়ান বাজো থেকে লারানতুকা পর্যন্ত বিস্তৃত।
উদ্ধারকর্মীরা সতর্ক করেছেন, মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। কারণ, দ্বীপটির ছয়টি রিজেন্সির প্রত্যন্ত কয়েকটি গ্রাম ভূমিধসে চাপা পড়েছে বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
জরুরি তৎপরতায় সহায়তার জন্য ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা একটি হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে। এর মাধ্যমে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো এবং প্রয়োজন হলে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ করা হবে।
পূর্ব নুসা তেংগারা বহু দ্বীপ নিয়ে গঠিত হওয়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছানো উদ্ধারকারী দলের জন্য বিশেষভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘ঘরের সবকিছু পড়ে গেল’
ভূমিকম্পের তীব্রতা কতটা ছিল, তা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রুটেং শহরের বাসিন্দা ইউলিয়ান জুইতা একালিয়া বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, তিনি এত বড় ভূমিকম্প আগে কখনো অনুভব করেননি। ভূমিকম্পের সময় মনে হচ্ছিল, তারা যেন ট্রাম্পোলিনের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন।
৩৭ বছর বয়সি এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বলেন, ভূমিকম্পের সময় তিনি দ্রুত ঘরের বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। তখন টেলিভিশন, তার ছেলের ট্রফি, থালা রাখার তাক এবং আলমারির ওপর রাখা স্যুটকেসসহ ঘরের সবকিছু পড়ে যায়। বাইরে বের হয়ে তিনি দেখেন, তার ছেলে ও প্রতিবেশীরা আগেই সেখানে চলে এসেছেন। তারা সবাই ভয়ে চিৎকার করছিলেন।
ভূমিকম্পের পর স্থানীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে কয়েকটি হাসপাতাল থেকে রোগীদের বাইরে সরিয়ে নিতে দেখা যায়। হাসপাতালের কর্মীরা বিছানা, অক্সিজেন সিলিন্ডার ও চিকিৎসার অন্যান্য সরঞ্জাম বাইরে নিয়ে যান। সেখানে অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রও স্থাপন করা হয়।
ভূমিকম্পপ্রবণ ইন্দোনেশিয়া
প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থান করায় ইন্দোনেশিয়ায় প্রায়ই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হয়। এই অঞ্চলটি তীব্র ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত।
১৯৯২ সালেও বড় ধরনের ভূমিকম্পে ফ্লোরেস ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট সুনামিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষ মারা যায়।
২০১৮ সালে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের পর স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী সুনামি আঘাত হানে। এতে উপকূলীয় এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ৪ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ মারা যায়।
এরও আগে ২০০৪ সালে সুমাত্রার উপকূলের কাছে ৯ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর ফলে সৃষ্ট সুনামিতে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারা যায়।
সূত্র: টাইমস নাউ






