ভারতের তরুণদের ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন এবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপির জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ছাত্র আন্দোলনের চাপে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, উপনির্বাচনে পরাজয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের মন জয়ের ব্যর্থ চেষ্টা—সব মিলিয়ে বিজেপিকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলে চাপ সৃষ্টি করেছে। টানা সাত সপ্তাহের আন্দোলনের মুখে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। এর পরপরই কয়েকটি উপনির্বাচনে বিজেপির পরাজয় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।বেকারত্ব, চাকরির পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ থেকে তরুণদের মধ্যে এই আন্দোলনের বিস্তার ঘটে। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে গত মে মাসে ইনস্টাগ্রামে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে। পরে সেটিই ছাত্র ও তরুণদের আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়। আন্দোলন শুধু দিল্লিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; ভারতের বিভিন্ন শহরে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।
উপনির্বাচনে ধাক্কা
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে দুটিতে হেরেছে বিজেপি। এর মধ্যে বিহারের ব্যাংকিপুর আসনে দলটির পরাজয় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। প্রায় তিন দশক ধরে বিজেপির দখলে থাকা এই আসন হাতছাড়া হওয়াকে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু উপনির্বাচনের ফল দেখে বিজেপির শক্তি কমে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই ঠিক হবে না। ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিজেপি এখনো শক্তিশালী এবং নির্বাচনীভাবে অত্যন্ত সংগঠিত দল।
তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা
তরুণদের ক্ষোভকে গুরুত্ব দিয়ে বিজেপিও নতুনভাবে তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা শুরু করেছে। মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেছেন। ইনস্টাগ্রাম ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে তরুণদের আকৃষ্ট করতে নতুন ধরনের প্রচারণাও চালাচ্ছে দলটি।
উত্তর প্রদেশে তরুণদের জন্য বিশেষ যোগাযোগ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজেপির এসব প্রচারণা অনেক ক্ষেত্রে উল্টো সমালোচনা ও হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একসময় বিজেপি যেভাবে নিজের রাজনৈতিক বার্তা সহজে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারত, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে সেই প্রভাব এখন আগের মতো নেই। ইনস্টাগ্রামের মতো বিকেন্দ্রীভূত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির প্রচলিত প্রচারণা কৌশল কার্যকর হচ্ছে না।
পুরোনো কৌশলও কাজ করছে না
বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের দেশবিরোধী, বিদেশি অর্থায়নপুষ্ট বা ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে তুলে ধরার পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল এবার তেমন কার্যকর হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এতে বিভিন্ন ধর্ম, জাতপাত ও সামাজিক শ্রেণির তরুণরা অংশ নিয়েছেন। এমনকি বিজেপির সমর্থক হিসেবে পরিচিত উচ্চবর্ণের হিন্দু তরুণদেরও আন্দোলনে দেখা গেছে।
ফলে আন্দোলনটিকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীর আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিজেপির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন বিজেপির ক্ষমতা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে দুর্বল করেনি, কিন্তু সরকারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতায় প্রশ্ন তুলেছে।
বিজেপি এখনো ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি। তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেকারত্ব, শিক্ষা, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা আগামী দিনে বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হতে পারে।
আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তদের একাংশ বলছে, শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ তাদের লক্ষ্য নয়। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, জাতপাত, সাম্প্রদায়িকতা এবং নারীবিরোধী রাজনীতিসহ দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যার পরিবর্তন চান তারা।
তবে বিজেপি তার হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসবে—এমন সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বরং আগামী নির্বাচনে ধর্মীয় পরিচয় ও হিন্দুত্বের রাজনীতিকেই আরও জোরালোভাবে সামনে আনার চেষ্টা করতে পারে দলটি।
সূত্র: আল জাজিরা






