বাংলাদেশ ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক জিসান প্রধানের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় সংসদে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, তদন্তে দেখা গেছে তিনি নিখোঁজ ছিলেন না, বরং বিয়ে এড়াতে আত্মগোপনে ছিলেন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ, ভ্রণ নষ্ট করা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
রোববার (১৪ জুন) সংসদে ৩০০ বিধিতে দেয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা জানান। যদিও বিবৃতিকে অত্যন্ত নিন্দনীয় আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। এসময় সরকারি ও বিরোধীদলের সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক হট্টগোল ও বাগবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, ২০২৪ সালের ১২ জুন কুমিল্লার দাউদকান্দি থানায় মোহাম্মদ রাসেল আহমেদ নামে এক ব্যক্তি জিসান মিয়া প্রধান নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অভিযোগে বলা হয়, আগের দিন রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে দাউদকান্দি বাজার এলাকা থেকে তিনি নিখোঁজ হন। জিডির পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লা জেলা পুলিশের একাধিক টিম তাকে উদ্ধারে মাঠে নামে। তদন্তকালে জিসানের স্বজনদের কাছ থেকে পুলিশ জানতে পারে, কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে এক নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং পরে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জিসান প্রধান ওই নারীকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কে জড়ান। একপর্যায়ে ওই নারী গর্ভবতী হলে তাকে গর্ভপাত করানোর জন্য চাপ দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, গর্ভপাত না করলে তাকে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে গর্ভপাতের জন্য ওষুধ সংগ্রহ করে ভুক্তভোগীকে সেবন করানো হয়। এর ফলে ভ্রণ নষ্ট হয় এবং শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে আরও চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রহ করে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পরে ভুক্তভোগী নারী বিয়ের জন্য চাপ দিলে জিসান বিয়েতে সম্মতি দিলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই আত্মগোপনে চলে যান। এরপর তার পক্ষ থেকে নিখোঁজের জিডি করা হয়।
তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ স্থানীয় সূত্রের সহায়তায় আত্মগোপনে থাকা জিসান মিয়া প্রধান এবং সংশ্লিষ্ট নারীকে থানায় নিয়ে আসে। সেখানে ভুক্তভোগী নারী জিসানকে প্রধান আসামি করে ধর্ষণ, ধর্ষণে সহযোগিতা, ভ্রণ নষ্ট করা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মামলায় জিসান ছাড়াও আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় রুজু করা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জিসান প্রধান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছিল। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের পর বিষয়টি জাতির সামনে তুলে ধরার স্বার্থে জাতীয় সংসদে এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি কোনো ঘটনার বিষয়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের ফলাফলের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানান।
অপরদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরপরই ফ্লোর নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান বিরোধীদলীয় উপনেতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, ‘সাবেক আইজিপিকে গ্রেফতারের সাফল্যে সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছি। কিন্তু একজন ছাত্রনেতাকে কেন্দ্র করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এটি একটি দলের চরিত্র হননের জন্য পরিকল্পিত প্লট। সংসদের ইতিহাসে একটি নির্দিষ্ট দলকে টার্গেট করে এভাবে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। আর জিসান এখন কোথায়? কেন সাংবাদিকদের বা তার পরিবারকে ওই নারীর সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হচ্ছে না? আমরা এই বক্তব্য রেকর্ড থেকে এক্সপাঞ্জ (প্রত্যাহার) করার দাবি জানাচ্ছি।
এ সময় বিরোধীদলীয় সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তার বক্তব্যকে সমর্থন জানান এবং সরকারি দলের সদস্যরা পাল্টা হট্টগোল শুরু করলে সংসদ কক্ষে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ডেপুটি স্পিকার সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান।






