ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

ঐতিহাসিক নির্বাচনের মহাযজ্ঞ: ভোটযুদ্ধে দেশ

Authorনিউজ রুম

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:১১ এএম

ঐতিহাসিক নির্বাচনের মহাযজ্ঞ: ভোটযুদ্ধে দেশ

কয়েক মাসের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং তীব্র প্রচার-প্রচারণার পর দেশ আজ ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। সকল প্রস্তুতি শেষ, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সারা দেশের ভোটাররা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে তাদের ভোট দেবেন।

নজিরবিহীন ব্যয়, ব্যাপক নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন এবং উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে এবারের নির্বাচন বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ হবে। নির্বাচনে ৫০টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট দুই হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। এ ছাড়া আরও আটটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এই নির্বাচন থেকে দূরে রয়েছে।

এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচন কমিশন দেশের মোট ভোটকেন্দ্রের অর্ধেককেই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার ফলে দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আর্থিক ও প্রশাসনিক উভয় দিক থেকেই এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তরুণ ও আওয়ামী-ঘেঁষা ভোটাররাই জয়ের চাবিকাঠি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফলাফল মূলত দুটি গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করতে পারে: তরুণ ভোটার এবং ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থক গোষ্ঠী।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪ কোটি ৩৩ লাখেরও বেশি ভোটার ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। এরা মোট ভোটারের প্রায় ৩৫ শতাংশ। জাতীয় যুব নীতি অনুযায়ী তাদের ‘তরুণ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এই তরুণদের একটি বড় অংশ গত তিনটি সংসদীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। এবারই প্রথম তারা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং তাদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে, ব্যালটে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তাদের সমর্থকদের পছন্দকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঐতিহাসিক ভোটের পরিসংখ্যান তাদের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। দলটি ১৯৯১ সালে ৩০ দশমিক ০৮ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে ৩৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ২০০১ সালে ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যে প্রার্থী তরুণ এবং আওয়ামী-ঘেঁষা ভোটারদের আকর্ষণ করতে পারবেন, তিনি নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারণাতেও এই দুই অংশকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।

১১ লাখ ভোটারের পোস্টাল ব্যালট

নির্বাচন কমিশনের ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত ১৫ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে ১৫ লাখ ২৮ হাজার ৮৬ জনের জন্য ব্যালট প্রস্তুত করা হয়েছিল।

সংগৃহীত তথ্য মতে, ১০ লাখ ৯৬ হাজার ২৫০ জন ভোটার তাদের পোস্টাল ব্যালট জমা দিয়েছেন। বাকিচার লাখ ৩১ হাজার ৮৮১ জন ভোটার তাদের ভোট দেননি। যারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন তাদের মধ্যে পাঁচ লাখ ১৫ হাজার ৬১৯ জন প্রবাসী এবং পাঁচ লাখ ৮০ হাজার ৬৬৫ জন দেশের অভ্যন্তরের ভোটার। এখন পর্যন্ত বিদেশ থেকে পাঁচ লাখ সাত হাজার ৩২৫টি ব্যালট বাংলাদেশে পৌঁছেছে, যার মধ্যে চার লাখ ৪৪ হাজার ৪৩৬টি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ পোস্টাল ব্যালটের মধ্যে চার লাখ ৩৮ হাজার ৯৫১টি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে জমা পড়েছে।

সাড়ে ৯ লাখের বেশি নিরাপত্তা সদস্য

জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় নয় লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোতায়েন করা বাহিনীর মধ্যে রয়েছে এক লাখ তিন হাজার সেনা সদস্য, পাঁচ হাজার নৌবাহিনীর সদস্য, সাড়ে তিন হাজার বিমান বাহিনীর সদস্য, ৩৭ হাজার ৪৫৩ বিজিবি সদস্য, তিন হাজার ৫৮৫ কোস্ট গার্ড সদস্য, এক লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য,নয় হাজার ৩৪৯ র‌্যাব সদস্য এবং পাঁচ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন আনসার সদস্য।

এ ছাড়া পোস্টাল ব্যালট গণনা কেন্দ্রে শৃঙ্খলা রক্ষায় এক হাজার ৯৮২ জন বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) সদস্য সহায়তা করবেন।

সবচেয়ে ব্যয়বহুল ৩,১৫০ কোটি টাকার নির্বাচন

সংসদীয় নির্বাচন এবং গণভোট মিলিয়ে এবারের নির্বাচনের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

এর মধ্যে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে, যা পরবর্তীতে আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এই খাতের সবচেয়ে বড় অংশ ৫৪৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে আনসার বাহিনী। পুলিশের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭০ কোটি ২১ লাখ টাকা। সেনাবাহিনী ১৪৮ কোটি টাকা, নৌবাহিনী ২৩ কোটি টাকা এবং বিমান বাহিনী ১৩ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ পেয়েছে।

নির্বাচন পরিচালনার জন্য আরও এক হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ডাকযোগে ভোটের ব্যবস্থার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলিত ব্যয় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো গণভোটের প্রচারণায় কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।

বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট

নির্বাচনী অপরাধ তদারকির জন্য ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে। তারা ভোটের দুই দিন আগে, ভোটের দিন এবং ভোটের পরের দুই দিন—অর্থাৎ মোট পাঁচ দিন মাঠে থাকবেন। এ ছাড়া আরও এক হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।

এক নজরে প্রার্থী ও ভোটার

২৯৯টি আসনে মোট দুই হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এক হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী ৮৩ জন, যাদের ৬৩ জন রাজনৈতিক দলের এবং ২০ জন স্বতন্ত্র।

দেশে বর্তমানে মোট নিবন্ধিত ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ছয় কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ছয় কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন এক হাজার ২৩২ জন।

অর্ধেক ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ

নির্বাচন কমিশন দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২১ হাজার ৫০৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাকি ২১ হাজার ২৭৩টি কেন্দ্রকে সাধারণ হিসেবে ধরা হয়েছে।

মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ থেকে ১৭ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ থেকে ১৮ জন নিরাপত্তা সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। মেট্রোপলিটন এলাকায় সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন সদস্য মোতায়েন থাকবেন। বিশেষ দুর্গম এলাকাগুলোতে প্রতি কেন্দ্রে ১৬ থেকে ১৮ জন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

নির্বাচনী কর্মকর্তা

ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকবেন মোট সাত লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন নির্বাচনী কর্মকর্তা। এর মধ্যে ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিসাইডিং অফিসার, দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং চার লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং অফিসার রয়েছেন। এ ছাড়া ৬৯ জন রিটার্নিং অফিসার এবং ৫৯৮ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করবেন।

পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক

নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকছেন ৪০টি দেশ ও ৮টি আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক। এদের মধ্যে ৫৭ জনকে নির্বাচন কমিশন আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং ৩৩৫ জন ব্যক্তিগত উদ্যোগে আসছেন। এ ছাড়া ৮০টি স্থানীয় সংস্থার ৪৫ হাজার ৯৯৫ জন দেশি পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। প্রায় নয় হাজার ৭০০ সাংবাদিক নির্বাচন কভার করার জন্য নিবন্ধন করেছেন, যার মধ্যে বিদেশি সাংবাদিক ১৫৬ জন।

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও মামলা

তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ৪৬১টি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কর্তৃপক্ষ এ পর্যন্ত ২৫৯টি মামলা দায়ের করেছে এবং মোট ৩১ লাখ ১৫ হাজার ৪৯০ টাকা জরিমানা আদায় করেছে।

যেখানে ভোট দেবেন নির্বাচন কমিশনাররা

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে ১০টার মধ্যে ইস্কাটন গার্ডেন হাই স্কুলে নিজের ভোট দেবেন। এরপর তিনি বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে ফিরবেন।

নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার রূপগঞ্জের দাউদপুর পুটিনা হাই স্কুলে ভোট দেবেন। কমিশনার আবদুর রহমানেল মাসুদ ভোট দেবেন উত্তরা আলোর ধারা স্কুলে। কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বেইলি রোডের ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এবং কমিশনার তাহমিদা আহমেদ আজিমপুর অগ্রণী স্কুল অ্যান্ড কলেজে তাদের ভোট দেবেন।

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!
Radio Barta App Screen 1
Radio Barta App Screen 2
রেডিও বার্তার সব নিউজ পেতে ডাউনলোড করুন মোবাইল অ্যাপ
ক্লিক করুন