চট্টগ্রামের আবাসন খাতে যখন দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নীতিগত সংস্কারের দাবি উচ্চারিত হচ্ছে, ঠিক তখনই সেই খাতেরই একজন শীর্ষ পর্যায়ের ডেভেলপার ও সংগঠনের নির্বাচিত প্রার্থীকে ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগগুলোর কেন্দ্রে রয়েছেন এমিটি অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুর উদ্দিন আহমেদ। যিনি আসন্ন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর নির্বাচনে ‘প্রগতিশীল আবাসন ব্যবসায়ী পরিষদ’-এর হয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট (চট্টগ্রাম) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন (ব্যালট নং-২২)।
অভিযোগ অনুযায়ী, একদিকে যখন তিনি আবাসন খাতে স্বচ্ছ নীতি ও ব্যবসাবান্ধব সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটের মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন, ঠিক তখনই তার নিজস্ব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ঘিরে একাধিক প্রকল্পে ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন, অনুমোদনবিহীন নির্মাণ এবং গ্রাহক নিরাপত্তা ঝুঁকির অভিযোগ উঠেছে।
এমিটি অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপার্স রিহ্যাবের সদস্য (১৫৬২/২০১৯)ভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নুর উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী রেহানা আক্তার। পারিবারিক মালিকানাধীন এই ব্যবসায়িক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত প্রকল্পগুলো নিয়েই এখন মূল বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। অভিযোগগুলো এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন আবাসন খাতের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন রিহ্যাব আগামী ১৮ এপ্রিল নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং যেখানে নীতিগত সংস্কার, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন ও খাতকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্যানেলের পক্ষ থেকে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্পটি হলো চট্টগ্রাম নগরের লাভ লেইন এলাকার আবেদীন কলোনিতে নির্মিত ‘এমিটি সেলিম এনজেলিক’ ভবন। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এই ভবনের জন্য ৮ তলার অনুমোদন প্রদান করেছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই অনুমোদনের শর্ত ভঙ্গ করে ভবনটি ১১ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে সিডিএর দৃষ্টিতে ভবনটি বর্তমানে অননুমোদিত ও অবৈধ স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিষয়টি শুধু নীতিমালা লঙ্ঘনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি গ্রাহক নিরাপত্তা ও নগর পরিকল্পনার শৃঙ্খলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ‘এমিটি অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপার লিমিটেড’ পরবর্তীতে ৮ তলার অনুমোদন বাতিল করে ১১ তলার অনুমোদনের জন্য একটি আবেদন দাখিল করে, যার নম্বর ২৫.৪৭.১৫০০.০৭৩.৪৩.১২১.২৪। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আবেদন জমা দেওয়ার আগেই ভবনটির ১১ তলা পর্যন্ত নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয়। অর্থাৎ, অনুমোদন প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় কিংবা তার আগেই পুরো নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ায় বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে আরও জটিল আকার ধারণ করে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে করা ওই আবেদন এখনো অনুমোদন পায়নি।
এই প্রকল্পটি ঘিরে প্রশাসনিক পর্যায়ে তদন্তও শুরু হয়েছে বলে জানা যায়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনসারী জানান যে, ভবনটির জন্য ১১ তলার কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি, বরং ৮ তলার অনুমোদনই বৈধ ছিল।
সিডিএর অথরাইজড অফিসার প্রকৌশলী তানজিব হোসেন বলেন,’ সিডিএর তদারকি দল সরেজমিনে পরিদর্শন করে ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে এবং এ বিষয়ে ইতোমধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শুধু একটি প্রকল্পই নয়, একই ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরেকটি প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নগরীর ১২ এম এম আলী সড়কের ‘এমিটি রওশন’ নামের প্রকল্পটি নিয়েও একই ধরনের বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। নথি অনুযায়ী, এই প্রকল্পের জন্য ৯ তলা ভবনের অনুমোদনের আবেদন করা হলেও অনুমোদন পাওয়ার আগেই নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ভবনটির ইতোমধ্যে তিনতলার ছাদ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে এখানেও অনুমোদন প্রক্রিয়া ও বাস্তব নির্মাণ কার্যক্রমের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এ দুটি প্রকল্প নিয়েই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখন আবাসন খাতে ঘুরপাক খাচ্ছে—অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ না হতেই কীভাবে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলো এবং সেটি কাদের তদারকিতে হয়েছে। কারণ, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি বহুতল ভবন নির্মাণে নির্দিষ্ট অনুমোদন, নকশা ও পর্যায়ক্রমিক পরিদর্শন বাধ্যতামূলক। সেই নিয়ম উপেক্ষা করে নির্মাণ কাজ এগিয়ে যাওয়ার ঘটনা নগর পরিকল্পনা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
এই দুই প্রকল্পের বিষয়ে এমিটি অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুর উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।একইভাবে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান রেহানা আক্তারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি কল কেটে দেন।
এদিকে শুধু প্রকল্পগত অনিয়ম নয়, সংগঠনগত আচরণ নিয়েও নুর উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। রিহ্যাব নির্বাচন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি নির্বাচন বোর্ডের সচিবের সঙ্গে বল প্রয়োগ, অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং অশালীন কথাবার্তার অভিযোগে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। রিহ্যাব নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. জহিরুল হক ভুঁইয়া স্বাক্ষরিত ওই নোটিশের স্মারক নম্বর রিহ্যাব/নি.বো./২০২৬/০৮। একই সঙ্গে এই নোটিশের অনুলিপি রিহ্যাব নির্বাচন আপিল বোর্ড, এফবিসিসিআই এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানা যায়। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি এখনো ওই শোকজের কোনো জবাব দেননি।
আইনগত দিক থেকে বিষয়টি আরও গুরুতর। ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৩(১) ধারা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ১৯৯৬-এর ৩ উপবিধি অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণ স্পষ্টভাবে অবৈধ। একই আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধ মোবাইল কোর্টের আওতায় বিচারযোগ্য। রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ীও প্রকল্প শুরুর আগে নকশা ও অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
আবাসন খাতে একজন প্রভাবশালী ডেভেলপারের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগগুলো শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধ বিষয় নয়, বরং পুরো খাতের নিয়ন্ত্রণ, নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে যখন একই ব্যক্তি আবাসন খাতের নীতিনির্ধারণী সংগঠনের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তখন স্বার্থের সংঘাত ও নৈতিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা তৈরি হচ্ছে।
ভোটারদের একটি অংশের মতে, যে ব্যক্তি নিজের প্রতিষ্ঠানে আইন ও নীতিমালার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্নের মুখে, তিনি কীভাবে পুরো খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন এই প্রশ্ন এখন ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে।
বার্তা বাজার/এমএমএইচ






