ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

আ.লীগ নেতার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা প্রত্যাহারের আবেদন বিএনপি নেতার, সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে

Authorস্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম

আ.লীগ নেতার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা প্রত্যাহারের আবেদন বিএনপি নেতার, সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় পাঁচ বছর আগে মাসুদ রানা (৪৫) নামের এক ইতালিপ্রবাসীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ইমদাদুল হক বাচ্চুকে (৬০) প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা করে পরিবার। তদন্ত শেষে ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা। আদালতে মামলার বিচারকাজও চলছে। কিন্তু সেই হত্যা মামলাকে ‘রাজনৈতিক মামলা’ জানিয়ে তা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করেছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক।

চলতি বছরের ৮ এপ্রিল মামলাটি জেলায় ‘বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে করা হয়রানিমূলক মামলাসমূহ প্রত্যাহারসংক্রান্ত যাচাই-বাছাই কমিটি’র সর্বসম্মতিক্রমে মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশের জন্য চূড়ান্ত করা হয়। গত ২৩ এপ্রিল ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা স্বাক্ষরিত সেই সুপারিশপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তোলে নিহত মাসুদ রানার পরিবার। এ সময় তারা হত্যা মামলার নথিপত্র, রাজনৈতিক মামলা হিসেবে তা প্রত্যাখ্যানের আবেদনসহ বিভিন্ন নথিপত্র সাংবাদিকদের সরবরাহ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে মাসুদ রানার বৃদ্ধ মা হালিমা বেগমের (৭৫) পক্ষে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান তাঁর ছোট ছেলে আসাদুজ্জামান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন নিহত মাসুদ রানার স্ত্রী শাহীন আফরোজ রোজা ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে মাসুদা মেহেরুবাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। তাঁরা ভাঙ্গা উপজেলার হামিরদি ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের বাসিন্দা।

লিখিত বক্তব্যে আসাদুজ্জামান জানান, ২০০৪ সাল থেকে ১৮ বছর ধরে তাঁর বড় ভাই মাসুদ রানা ইতালিতে বসবাস করে আসছিলেন। ২০১৭ সালে স্ত্রী ও দুই সন্তানকেও তিনি সেখানে নিয়ে যান। পরে ২০২১ সালে দেড় মাসের ছুটিতে দেশে আসেন মাসুদ রানা। সে সময় তাঁদের গ্রামে দুই পক্ষের বিরোধ মেটাতে তিনি উদ্যোগ নেন। এতে গ্রাম্য মোড়ল ও পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ইমদাদুল হক বাচ্চুর অনুসারীরা তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৩ এপ্রিল রাতে ভাঙ্গা উপজেলার নওপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দলবল নিয়ে ধারালো অস্ত্র, চাপাতি ও রামদা দিয়ে মাসুদ রানাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দুই দিন পর ১৫ এপ্রিল ৩৫ জনকে আসামি করে ভাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেন মাসুদের মা হালিমা বেগম।

আসাদুজ্জামান আরও জানান, এই মামলায় একই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর হত্যাকাণ্ডের বিবরণ, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ধারালো ছোরার ফরেনসিক প্রতিবেদনসহ ৩৪ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক মো. ফরহাদ হোসেন। অভিযোগপত্রে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ইমদাদুল হক বাচ্চুর নেতৃত্বে ও নিজেই কুপিয়ে জখম করেন বলে উল্লেখ করা হয়। মামলাটি ফরিদপুরের অতিরিক্ত দায়রা জজের দ্বিতীয় আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে পরিবারটির উত্থাপিত নথিপত্রে দেখা যায়, আদালতে চলমান মামলাটি চলতি বছর রাজনৈতিক মামলা উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের আবেদন করেন ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেস আলী ইছা। এতে তিনি সব আসামির নাম উল্লেখ করেন। পরে চলতি বছরের ৮ এপ্রিল জেলায় ‘বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে করা হয়রানিমূলক মামলাসমূহ প্রত্যাহারসংক্রান্ত যাচাই-বাছাই কমিটি’র সর্বসম্মতিক্রমে প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশের জন্য চূড়ান্ত করা হয়।

ওই সুপারিশপত্রে স্বাক্ষর করেন কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা (সাবেক), সদস্যসচিব ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিন্টু বিশ্বাস, সদস্য ও পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আশরাফুজ্জামান নান্নু।

গত ২৩ এপ্রিল ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা স্বাক্ষরিত ওই সুপারিশপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; আইন ও বিচার বিভাগ; আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়; মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বৃদ্ধ হালিমা বেগম ছেলে হত্যার ন্যায়বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে আমার দাবি, আমি জীবিত থাকতে যেন ন্যায়বিচারটা দেখে যেতে পারি। আমার ছেলের শোকে চার মাস পর আমার স্বামীও স্ট্রোক করে মারা গেছেন।’

হত্যা মামলা কীভাবে রাজনৈতিক মামলা হয়, সেই প্রশ্ন তুলে মাসুদ রানার মা হালিমা বেগম বলেন, ‘এই মামলা তদন্ত করে দেখুক, আমার ছেলের কোনো দোষ ছিল কি না।’

হালিমা বেগম আরও বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িতও ছিল না এবং বাংলাদেশের ভোটারও ছিল না। এলাকার মানুষের জন্য কাজ করত। গরিব মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল সে। বিভিন্নভাবে মানুষের সহযোগিতাও করত। তাকে এমনভাবে মারছে যে, একটি দোকানে গিয়ে পালিয়েছিল, সেখানে ঢুকে ওই বাচ্চু লোকজন নিয়ে মারছে। এই মামলা কীভাবে রাজনৈতিক মামলা হয়, আমি জানি না।’

নিহত মাসুদের ভাই আসাদুজ্জামান অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ভাইকে যারা কুপিয়ে হত্যা করেছে, তারা আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা-কর্মী। তারা সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার ভয়ে বর্তমানে ভোল পাল্টে ক্ষমতাশালী দলের নেতাদের সঙ্গে মিশে ও তদবির-বাণিজ্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক মামলা হিসেবে সুপারিশ করিয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক আসামিই আমার ভাই হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল, যেটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।’

জানতে চাইলে মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদনকারী ও ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেস আলী ইছা বলেন, কেউ ভালো-মন্দ বলতেই পারেন। আবেদনের পরে এটা আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতার বিষয়ে বলেন, ‘আমি তো আর সারা দেশের মানুষ চিনি না, কে কোন দল করেন।’

মামলাটি আদালতে বিচারাধীন থাকার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. শফিউদ্দিন মুন্সি শফিক। তিনি বলেন, আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্র অনুযায়ী মামলাটি বিচারকাজের জন্য অভিযোগও গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে অন্তত ১৩ জনের সাক্ষ্য নিয়েছেন আদালত। এই মামলা কোনোভাবেই রাজনৈতিক হিসেবে গণ্য করা ঠিক হবে না।

মামলায় গ্রেপ্তার আসামিদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে শফিউদ্দিন মুন্সি শফিক বলেন, ‘এ মামলায় পাঁচ-ছয়জন আসামি দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রধান আসামি ইমদাদুল হক বাচ্চু দুই বছর কারাগারে ছিলেন। পরে জামিনে বের হয়ে আমাকেও ঘুষ দিয়ে প্রলোভন দেখানোর চেষ্টা করেছেন।’

‘বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে করা হয়রানিমূলক মামলাসমূহ প্রত্যাহারসংক্রান্ত যাচাই-বাছাই কমিটি’র সদস্যসচিব ও ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিন্টু বিশ্বাস বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে প্রথমে একটি লোকাল (স্থানীয়) তদন্ত হয়েছে। পরে পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশপত্র পাঠানো হয়েছে। পরিবারটি যদি প্রথম দিকে আমাদের জানাত, তাহলে আমরা পুনরায় তদন্তে পাঠাতাম। এখন তাঁরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আপত্তি জানাতে পারেন এবং আপত্তি অনুযায়ী পুনরায় তদন্তে দেওয়া হলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

 

বার্তা বাজার/এমএমএইচ

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!