বরিশালের বাকেরগঞ্জে ১৮ বছর বয়সী তরুণ হাসান গাজীকে বাবা-মায়ের হাতে হত্যার ঘটনায় নতুন তথ্য উঠে এসেছে। ঘটনার দিন মঙ্গলবার নিহত হাসানের বাবা জাফর গাজী ও মা নাজমা বেগম থানায় গিয়ে দায় স্বীকার করলেও, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের বক্তব্যে ভিন্ন কাহিনি প্রকাশ পেয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক বিবরণ
জাফর গাজী ও নাজমা বেগম জানায়, তাদের ছেলে হাসান মাদক সেবনের টাকা না দেওয়ায় তাদের ওপর চড়াও হন। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে জাফর গাজী তাকে আঘাত করলে হাসানের মৃত্যু হয়। কিন্তু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হাসানের চাচি কহিনূর বেগম বলেন, “হাসানের ডাকচিৎকার শুনে ঘরে গিয়ে দেখি, বাবা-মা মিলে হাসানকে মারধর করছেন। মা গলায় রশি দিয়ে টেনে ধরছিলেন, বাবা লোহার পাইপ দিয়ে পেটাচ্ছিলেন। আমি বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমাকে ঘর থেকে বের করে দেয়া হয়। পরে অন্য পুরুষের সাহায্যে ঢুকে দেখি হাসান মারা গেছে।”
টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে হত্যার আশঙ্কা
বাকেরগঞ্জ পৌরসভার সাহেবগঞ্জ এলাকার এই ঘটনা সামনে আসার পর জানা যায়, হাসান ছয় মাস আগে একটি জাহাজে চাকরি নিয়ে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। গত ১৫ দিন আগে বাড়ি ফেরেন। এরপর বাবার কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে বাবা-ছেলের মধ্যে চলছিল বিরোধ। স্বজনরা বলছেন, জাফর গাজী জুয়া খেলার জন্য হাসানের টাকা নিয়ে নেশায় ব্যয় করতেন এবং টাকা চাইলে মারধর করতেন।
মাদকসংশ্লিষ্টতার দাবিতে প্রতিবাদ
হাসানের স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মশিউর রহমান মুসা জানান, হাসান নেশার সাথে জড়িত ছিলেন না এবং তিনি কখনো বেয়াদবি করেননি। হাসানের বন্ধু সুমনও বলছেন, “ওকে কখনো মাদক সেবন করতে দেখিনি। ওর নামে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে।”
পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ
হাসানের এক বন্ধুর মা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, হাসানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার বক্তব্য, হাসানের বাবা জুয়া আসক্ত এবং মা নাজমা বেগম মাদক বিক্রেতা ছিলেন। হাসান এটা পছন্দ করতেন না, এজন্য পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার বিবাদ ছিল।
পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি
হাসানের চাচা কালাম গাজী জানান, জাফর গাজী মাছের ব্যবসা করলেও জুয়ায় আসক্ত ছিলেন এবং প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকার ঋণে জর্জরিত।
মামলার বর্তমান অবস্থা
মৃত্যুর পর মঙ্গলবার রাতে বাবা জাফর গাজী থানায় আত্মসমর্পণ করেন। তবে হাসানের বোন সান্তা আক্তার একমাত্র জাফরকে আসামি করে মামলা করেন। তার অভিযোগে মা নাজমা বেগমকে ছাড় দেয়া হয়। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দেলোয়ার হোসেন বলেন, “প্রাথমিকভাবে নেশার টাকা নিয়ে বিরোধ থেকেই ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। আসামির সংখ্যা নির্ভর করবে তদন্ত ও বাদীর সিদ্ধান্তের ওপর।”
বাকেরগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম জানান, “বাদীর আপত্তি না থাকায় মাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাবা জাফর গাজীকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পর বিস্তারিত জানা যাবে।”
সংক্ষিপ্তসার
- বরিশালের বাকেরগঞ্জে হাসান গাজীকে বাবা-মায়ের হাতে হত্যা
- বাবা-মা থানায় দায় স্বীকার করলেও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ভিন্ন
- টাকা ফেরত চাওয়া ও মাদক-জুয়া নিয়ে বিরোধের কারণে ঘটনা ঘটে বলে ধারণা
- পরিবার ও শিক্ষকদের অভিযোগ হাসান মাদকাসক্ত নন
- মামলায় একমাত্র বাবা জাফর গাজীকে আসামি করে তদন্ত চলছে






