ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। নড়ে চড়ে বসেছে দেশের নাগরিক সমাজ।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দুপুর ১টার দিকে ভাঙচুর করা ভাস্কর্যটির স্থান পরিদর্শন শেষে শ্রদ্ধা নিবেদনে ম্যুরালে পুস্পস্তবক অর্পণ করেছেন ঢাকাভিত্তিক নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
প্রতিনিধি দলে ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও লেখক অগ্রদূত সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান, মানবাধিকার কমিশনের সাবেক কমিশনার ও গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নুর খান লিটন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ফারাহ তানজিম তিতিলসহ অনেকে।
সেখানে সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশে ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি ও পুনর্নির্মাণের দাবি জানান তারা।
এছাড়াও এ সময় উপস্থিত ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমানের বোন রিজিয়া বেগমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন তারা।
অগ্রদূত সম্পাদক আবু সাইদ খান মুজিবনগরের ঘটনাকে তুলে ধরেন এবং সম্প্রতি দেশে ঘটমান এ ধরনের পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা এবং বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য পুনঃস্থাপনের দাবি জানান।
গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন বলেন, আজকে এভাবে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য উপড়ে ফেলা হয়েছে! দুঃখজনক হচ্ছে প্রশাসনের কেউই এ ব্যাপারে জানেন না। আমার দেশের অস্তিত্ব হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য, আমার প্রাণের অস্তিত্ব। যারা এ ধরনের কাজ করেছে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের না। এ ভাস্কর্য পুনর্নির্মাণ করতে হবে।
সমাবেশে অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস ভাস্কর্য ভাঙার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করে বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বটমলাইন হলো মুক্তিযুদ্ধ, সেটা হচ্ছে একাত্তর। ’৭১-এর সঙ্গে আপস করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে কোনো কিছু চলতে পারে না। আমরা ৭১-কে ধারণ করি আমরা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে ধারণ করি। ভাস্কর্য কারা ভেঙেছে? যারা ’৭১-কে মানে না বাংলাদেশের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না।
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন মুক্তিযুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিচারণ করে ভাস্কর্য ভাঙার জন্য প্রশাসনকে দায়ী করেন এবং ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারহা তানজীম তিতিল বলেন, কোনো অপরাধী, দুষ্কৃতকারী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী লোকেরা যারা এ অপরাধ করেছে তাদের চিহ্নিত করতে হবে এবং আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে- এটা আমাদের প্রধান দাবি।
দুপুরে জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য অগ্রদূত সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান জানান, ওই বৈঠকে ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
বৈঠকে বীরশ্রেষ্ঠর বোন রিজিয়া বেগমসহ পরিবারের একাধিক সদস্য উপস্থিত ছিলেন। একই দাবি তুলে ধরেন তারাও।
উল্লেখ্য, গত ১৪ জুলাই সকালে হঠাৎ করে পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই জেলা শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় চার রাস্তার মোড়ে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুরের কাজ শুরু হয়। স্থানীয় প্রশাসন নানা কৌশলে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। গণমাধ্যমে খবর প্রচারের পর তোলপাড় শুরু হলে ১৭ জুলাই থেকে ভাঙচুরের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।
ভাস্কর্য ভাঙচুরের পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরে জেলা প্রশাসন একাধিক সভা করেছে। এতে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে আকার ধারণ করতে থাকে। ভাস্কর্য ভাঙচুরের খবর প্রকাশিত হলে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের কয়েকজন তোপের মুখে পড়েন। নানা ট্যাগ দিয়ে হেনস্তার চেষ্টা করা হয় তাদের।
এমতাবস্থায় বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্যসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সাংস্কৃতিক সংগঠন সভা সমাবেশ বিক্ষোভ করে ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।
বৃহস্পতিবার ঝিনাইদহ পৌর সভার প্রশাসক (উপ-সচিব) রথীন্দ্র নাথ রায় জানিয়েছেন, ভাস্কর্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত পৌরসভা গ্রহণ করেনি।
পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ ভাস্কর্য ও বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর উদ্বোধন করা হয়। পৌরসভার নিজস্ব অর্থে নির্মাণ কাজ শুরু করা হলেও করোনা মহামারিসহ নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি শেষপর্যন্ত অসমাপ্ত থেকে যায়।
বিশেষ একটি সূত্র জানায়, ভাস্কর্য ভাঙচুরের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই নড়াচড়া শুরু হয়। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপনের লক্ষ্যে ২২ জুলাই জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে স্থান নির্ধারণের জন্য প্রস্তুতিমূলক এক সভা ডাকা হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন। উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাসান, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মজিদসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধানরা, বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যরা।
ওই সভায় জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের বর্তমান আহ্বায়ক মো. আব্দুল মজিদ মাস্টারকে কমিটির প্রধান (আহ্বায়ক) করে ১৫ সদস্যর একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সূত্রমতে, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, প্রশাসক জেলা পরিষদকে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করা হয়েছে।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা হাফিজুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকালে স্থান নির্ধারণের জন্য জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে; কিন্তু ওই সভায় উপস্থিত থাকলেও হাজিরা কাগজে স্বাক্ষর করেননি বলে জানান তিনি।
হাফিজুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের বিচার ও শাস্তি দাবি করে যে স্থানে ভাস্কর্যটি রয়েছে সেখানেই পুনর্নির্মাণের আবারও দাবি জানান।






