দেশকে গণতন্ত্রের পথে ফেরানোর জন্য বারবার যেই পরিবারটি বুক পেতে দিতে অকুতোভয়, সেটি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরিবার। এই পরিবারের দুই প্রজন্মের তিন নেতারই একটি জায়গায় মিল রয়েছে— তারা তিনজনই প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে সফল হয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ যখন বিভিন্ন ক্ষতয় ভুগছে, তখন ক্ষমতাসীনদের ‘বাকশাল’ গঠন প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্র তার পথ হারায়। এরপর শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্যু ঘিরে বাংলাদেশ উল্টোপথে চলতে শুরু করে তখনই ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। এরপর স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের মধ্যদিয়ে যখন দেশ গণতন্ত্রে ফেরার অপেক্ষায় তখন আবারও জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জনগণ বেছে নেন নিজেদের অভিভাবক হিসেবে। বাংলাদেশ পায় প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
এরপর ১৭ বছরের আওয়ামী নিপীড়ন এবং নির্যাতনে আবারও দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ নস্যাৎ করে আওয়ামী লীগ বেছে নেয় সুবিধাভোগী বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে। অন্যদিকে মানুষের মত প্রকাশের পথকে করে দেয় পুরোপুরি রুদ্ধ। এমন এক বিষাক্ত পরিবেশের পরিবর্তনে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে গণতন্ত্র ফেরানোর ত্রয়োদশ নির্বাচনে আবারও জনতা বেছে নিয়েছে বিএনপি ও তারেক রহমানকে। নিরঙ্কুশ জয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আবারও সরকার গঠন করতে যাচ্ছে দলটি।
প্রথম ভোটেই জেতেন এবং প্রেসিডেন্ট হন জিয়াউর রহমান
দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে জিয়াউর রহমান ২৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে সেনাপ্রধান হন। খালেদ মোশাররফ যখন শাফাত জামিলের নেতৃত্বে ঢাকা ব্রিগেডের সমর্থনে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে একটি অভ্যুত্থান ঘটায়, তখন জিয়াউর রহমান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং গৃহবন্দি হন। ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লব তাকে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
জিয়াউর রহমান ১৯ নভেম্বর ১৯৭৬-এ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন যখন বিচারপতি সায়েম পদত্যাগ করেন এবং শেষ পর্যন্ত ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি সায়েম পদত্যাগ করলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।
এমন অবস্থায় রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় জনগণের অধিকার তাদের হাতে ফিরিয়ে দিতে গণতন্ত্র ফেরাতে কাজ শুরু করেন জিয়াউর রহমান। তিনি রাজনৈতিক দল তৈরির আগেই একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠনের চিন্তা করেন, যাতে করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে একটা বিস্তৃত প্লাটফর্ম বানানো যায়।
জিয়াউর রহমান একদিকে ‘সমমনা’ রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটি রাজনৈতিক জোট তৈরির কাজ করছেন, অন্যদিকে তিনি নিজস্ব একটা রাজনৈতিক দল তৈরির বিষয়টিও খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখলেন। তার মনে হলো জোটের মধ্যে শতভাগ অনুগত একটা দল না থাকলে জোটকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সে লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ বা ‘জাগদল’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল তৈরির ঘোষণা দেন।
১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করা হলো। একই বছরের ১ মে জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ ঘোষণা করা হয়। পরে জুন মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জিয়াউর রহমান। জনগণ ৭৬.৩৩ শতাংশ ভোট দিয়ে তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন।
জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গ্রুপের একটা প্ল্যাটফর্ম। পরে এর থেকে বেরিয়ে একক দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি গঠন করেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৮ সালের ২৮ আগস্ট ‘জাগদল’ বিলুপ্তির ঘোষণা দেন। আর ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির প্রধান হিসেবে দলের নাম, গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচি আনুষ্ঠানিক দল ঘোষণা করেন।
প্রথম নির্বাচনেই দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতারা খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আসার অনুরোধ জানান। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান এমন এক সময়ে ঘটেছিল, যখন এরশাদের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ তুঙ্গে।
১৯৮৬ সাল ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় মোড় আসে। ওই বছর এরশাদ নির্বাচনের ঘোষণা দিলে বিরোধীরা একে অসাংবিধানিক বলে প্রত্যাখ্যান করে। কারণ, তখনো সামরিক আইন জারি ও রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত ছিল। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি তা বর্জন করে। এ সময় থেকেই গণতন্ত্রের প্রশ্নে খালেদা জিয়ার আপসহীন অবস্থানের প্রকাশ ঘটে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তটি খালেদা জিয়ার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিল। আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনে অংশ নেয়, তখন সেটিকে অবৈধ ঘোষণা করে বর্জনের সিদ্ধান্ত তাকে নীতির প্রশ্নে আপসহীন একজন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদের সামরিক সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে কোনো দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। বিএনপি ১৪০টি আসন পায়; যেখানে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫১টি আসন। আওয়ামী লীগ ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি এবং জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে জয়ী হয়।
আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াত সংসদে বিএনপিকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন নিশ্চিত হয় খালেদা জিয়ার। আর বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়া তিন মেয়াদে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। প্রথমবার ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল; পরে ১৯৯৬ সালে সংক্ষিপ্ত দ্বিতীয় মেয়াদে কয়েক মাস এবং সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
নির্বাসন থেকে ফিরেই প্রথম নির্বাচনে তারেক ম্যাজিক
সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমানও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৮৮ সালে তিনি বগুড়া জেলা বিএনপির গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। যদিও দলে তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে। সে সময় খালেদা জিয়া যে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করেছিলেন তিনি সেগুলোর দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন।
তবে দলের রাজনীতিতে তার শক্ত প্রভাব শুরু হয়ে ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময়। ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। ওই নির্বাচনের প্রচার প্রচারণা ও নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। নির্বাচনের সময়ই দলের ভেতরে সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন তারেক রহমান। পরে ২০০২ সালের ২২ জুন দলের মধ্যে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ তৈরি করে তাকে ওই পদে অধিষ্ঠিত করা হয়।
বাংলাদেশে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর গ্রেফতার হয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। একইসঙ্গে আটক হয়েছিলেন তার প্রয়াত ছেলে আরাফাত রহমানও। খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের ছয় মাস আগেই গ্রেফতার হয়েছিলেন তারেক রহমান। সেই সময় তার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। গ্রেফতার ও কারাবন্দি অবস্থায় অমানবিক নির্যাতনের পর ২০০৮ সালে চিকিৎসার প্রয়োজন দেখিয়ে দেশ ছাড়েন তারেক রহমান। এক কথায় বলা যায় বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে নির্বাসনে পাঠানো হয় তাকে।
তবে বিদেশে বসেও আওয়ামী লীগের নির্যাতন এবং স্বৈরাচারী স্টাইলে দেশ চালানোর বিপরীতে দলকে সংগঠিত করা এবং গণতন্ত্রের জন্য লড়াই চালিয়ে যান তিনি। ২০১৮ সালে দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে লন্ডন থেকেই দল পরিচালনার কাজ শুরু করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে তার দেশে ফেরার সুযোগ তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি গত ডিসেম্বরে ঢাকায় ফিরে প্রত্যক্ষভাবে দলের হাল ধরেন।
দেশে ফেরার পর খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক। রাজনীতির বিভিন্ন নিপীড়নে ভেঙে না পড়ে দেশকে গণতন্ত্রের পথে ফেরাতে পুরোদমে কাজ শুরু করেন তিনি। জনগণকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গড়ার স্লোগানে একীভূত করেন। যার পুরো ফল উঠে এসেছে সর্বশেষ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে। নিজের প্রথম নির্বাচনে ঢাকা ও বগুড়ার দুটি আসন থেকে ব্যক্তিগতভাবে জয় পাওয়ার পাশাপাশি দলের ২১২টি আসন নিশ্চিত করে সরকার গঠনের অপেক্ষায় রয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
আর এরমধ্যে দিয়ে তারেক রহমানও বাবা ও মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করলেন। জীবনের প্রথম নির্বাচনে জয় নিয়েই বসতে যাচ্ছেন রাষ্ট্র ক্ষমতায়।






