ঢাকা   সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মৃত্যুফাঁদে

Authorস্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম

ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মৃত্যুফাঁদে

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবাধে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলোর বিষাক্ত ধোঁয়ায় মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য। প্রতিদিন শত শত চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, কার্বন, সালফার ডাই-অক্সাইডসহ ক্ষতিকর গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের গ্রামগুলোতে। এতে করে বাতাসের মান ভয়াবহভাবে দূষিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠছে দুর্বিষহ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইটভাটার কারণে পরিবেশ, জনবসতি, কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ জনবহুল এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিয়েছে। জেলায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ১৪৭ ইটের ভাটা রয়েছে। ৮৬টি ইটভাটা নবায়ন করা হয়নি। অনেকগুলো ভাটার নেই বিএসটিআই সনদ,কৃষি ও পরিবেশ ছাড়পত্র। অনেকেই মানছেন না ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ও শর্তাবলী।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় চোখ মেললেই দেখা মিলে ইটের ভাটা। স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল,হাট-বাজার ও গ্রামের ভেতর বসতবাড়ি ঘেরা কৃষি জমিতে ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ইটভাটার ধোঁয়ায় চারপাশ ঢেকে থাকে। শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখ জ্বালা-পোড়া, এমনকি শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে বিভিন্ন জটিল রোগ বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন এ ধরনের দূষিত পরিবেশে বসবাস করলে ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, ইটভাটার প্রভাব পড়ছে কৃষি ও জীববৈচিত্র্যেও। ফসলের জমিতে ধোঁয়া ও ধুলোর স্তর জমে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। গাছপালার পাতা কালো হয়ে যাচ্ছে, ফলে স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় ফলন কমে যাওয়ায় কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

পরিবেশবিদরা বলছেন, অধিকাংশ ইটভাটা পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়ম না মেনে পরিচালিত হচ্ছে। অনুমোদনহীন ভাটা, নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহার এবং পুরনো প্রযুক্তির কারণে দূষণ বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণে। তারা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। নইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য আরও ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

জানা যায়, জেলায় মোট ১৪৭টি ইটভাটার মধ্যে ৬১বৈধ এবং ৮৬টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে।এর মধে সদর উপজেলায় বৈধ ৪টি অবৈধ ৮টি,সরাইল বৈধ ১৯ অবৈধ ১৮,আখাউড়ায় বৈধ ৩ অবৈধ ২,আশুগঞ্জ বৈধ ৭ অবৈধ ২,কসবা বৈধ ১ অবৈধ ৫, নবীনগর বৈধ ১০ অবৈধ ১৮, নাসিরনগর বৈধ ৮ অবৈধ ১৪, বাঞ্ছারামপুর বৈধ ৩ অবৈধ ৩, বিজয়নগর বৈধ ৬টি অবৈধ ১৬টি ইটভাটা।

‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯)’ অনুযায়ী লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া ইটভাটা স্থাপন এবং ইট পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইনানুযায়ী কৃষি জমি, বনভূমি, আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ভাটা স্থাপন করা যাবে না এবং অবৈধ ভাটার জন্য জেল ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) আইন, ২০২৩ এবং ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া কৃষিজমির টপ সয়েল বা উপরিভাগের মাটি, পাহাড়, টিলা বা নদীর তলদেশ থেকে মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।অবৈধভাবে মাটি কাটলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।

নদ-নদী ও খাল-বিল এবং পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন‘ তরী বাংলাদেশ’ এর আহবায়ক শামীম আহমেদ বার্তা বাজার কে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তরী বাংলাদেশ। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ রক্ষা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় যখন আশপাশের জনপদ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে, তখন স্থানীয় জনগণকে সচেতন করতে সভা, মানববন্ধন ও প্রচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অবৈধ ও পরিবেশবিধি না মানা ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। এদিকে অন্যান্য জেলায় অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এখানে কিন্তু তেমন কার্যক্রম দেখা যায় না। অথচ অবৈধ ইটভাটাগুলো পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি নদী দখলেও পিছিয়ে নেই।

তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ইটভাটা পরিচালনা শুধু পরিবেশ ধ্বংস করছে না, বরং শিশু, বয়স্ক ও সাধারণ মানুষের জীবনে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। পরিবেশ রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আবু সাইদ বলেন,যাদের লাইসেন্স নাই আমরা অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা করছি,একসাথে সবগুলো অভিযান করা সম্ভব না,ধাপে ধাপে সব গুলোতেই অভিযান পরিচালনা করা হবে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপপরিচালক নাজিম হোসেন শেখ জানান,আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি,অভিযান অব্যাহত থাকবে।

 

বার্তা বাজার/এস এইচ

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!