যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আবহে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ইরাকের নতুন প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ওয়াশিংটনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
ক্ষমতা গ্রহণের পর নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক সফরের অংশ হিসেবে সোমবার (১৩ জুলাই) ওয়াশিংটনে পৌঁছান জাইদি। সপ্তাহব্যাপী এই সফরে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছাড়াও শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা এবং বড় বড় তেল কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নেবেন।
ভারসাম্যের রাজনীতি ও সশস্ত্র গোষ্ঠী নিষ্ক্রিয় করার চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- উভয় দেশই ইরাকের প্রধান মিত্র হওয়ায় দীর্ঘকাল ধরে দেশটিকে তাদের প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধের ময়দান হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ফলে দুই বৈরী দেশের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে ইরাকের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। চলতি বছর ট্রাম্পের সমর্থনে ক্ষমতায় আসা ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক জাইদি ভঙ্গুর ইরাকি অর্থনীতি পুনর্গঠন ও মার্কিন স্থাপনায় হামলাকারী ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ওয়াশিংটন সফরের আগে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে’ লেখা এক নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী জাইদি স্পষ্ট করে বলেছেন, তার সরকার এটি নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যেন অস্ত্রের বৈধ ব্যবহারের একক একচেটিয়া অধিকার কেবল রাষ্ট্রের হাতেই থাকে। ইতোমধ্যে তার সরকার ওয়াশিংটন কর্তৃক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র হওয়ার জন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।
অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরাকের একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়লেও তার অর্থ এই নয় যে ইরাক ইরানের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। মিত্রদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের এই ভারসাম্য বাগদাদকে বজায় রাখতেই হবে।
প্রতিরোধ ও মিলিশিয়াদের হুঁশিয়ারি
বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অস্ত্রের ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাকে অপরিহার্য মনে করছে ইরাক সরকার। জাইদি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তার বার্তা হলো- ইরাক আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব ও জোটের বাইরে থেকে কেবল উন্নয়নের পথ বেছে নিতে চায়। ইরাক সরকারকে সমর্থনের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে ইরাকের তেল রাজস্বের নগদ অর্থ সরবরাহ পুনরায় শুরু করেছে, যা মিলিশিয়াদের নিরস্ত্র করার চাপ হিসেবে চলতি বছরের শুরুতে স্থগিত করা হয়েছিল। তবে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী জাইদির সঙ্গে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও, অন্য শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় এই গোষ্ঠীগুলো তেহরানের সমর্থনে ইরাকের মার্কিন স্থাপনাগুলোতে ৬০০ বারেরও বেশি হামলা চালিয়েছিল। ইতোমধ্যে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ জাইদির এই মার্কিন সফরের তীব্র বিরোধিতা করে সামরিক দখলের পরিবর্তে আরও বিপজ্জনক ‘অর্থনৈতিক দখলদারিত্ব’ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে।
মার্কিন বিনিয়োগ ও জ্বালানি চুক্তি
দশকের পর দশক ধরে চলা যুদ্ধ ও অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে চাওয়া ইরাক এখনও দুর্বল অবকাঠামো, ভেঙে পড়া গণপরিষেবা ও চরম দুর্নীতির মুখোমুখি। জাইদি তার সফরে শীর্ষ মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ইরাকের অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তেল ও গ্যাস খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বেশ কিছু চুক্তি করেছে ইরাক। এই সফরে আরও কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে, যার মধ্যে একটি বিশেষ তহবিল গঠন অন্যতম; যেখানে ইরাক দৈনিক ৫ লাখ ব্যারেল তেল জমা রাখবে। তার বিনিময়ে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে। ওপেকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইরাকের জাতীয় বাজেটের ৯০ শতাংশই তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। এই তেলের সিংহভাগই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বার্তা বাজার/এস এইচ






