চলমান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও চুক্তিবদ্ধ কর্মীদের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন কোম্পানির মোবাইল নেটওয়ার্ক হ্যাক করেছে ইরান। মঙ্গলবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
‘মোবাইল সারভেইলেন্স মনিটর’ নামের একটি সংস্থার গবেষণা প্রকল্পের টেলিযোগাযোগ সংক্রান্ত তথ্য এবং এই বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, ইরানের মোবাইল হ্যাকের এই তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর মার্কিন আইনপ্রণেতারা বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, মোবাইল রোমিং ব্যবস্থা এবং স্মার্টফোনের বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে হামলার ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। ইরানের এই কাজের বিষয়ে অবগত সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, ইরান কিংবা তার মিত্ররা মার্কিন কর্মীদের অবস্থান শনাক্ত করতে স্থানীয় ফোন অপারেটরদের সঙ্গে থাকা রোমিং চুক্তির সুযোগ নিয়েছে বলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন।
অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা ইরাকের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে মার্কিন ফোনগুলো ট্র্যাক করতে বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত ডেটাবেস ব্যবহার করেছে।
সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থা সিটিজেন ল্যাবের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো গ্যারি মিলার এই ডেটা পর্যালোচনা করেছেন। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে তিনি বলেছেন, ‘‘রিয়েল-টাইমে তাৎক্ষণিক এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে মোবাইল ফোনের অবস্থানের তথ্য পাওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।’’
তিনি বলেন, এই অঞ্চলে মার্কিন ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করতে ইরান যদি এসএস৭ বা মোবাইল নেটওয়ার্ক অ্যাক্সেস ব্যবহার না করে থাকে, তাহলে সেটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের বিষয় হবে।
• চাপের মুখে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন টেলিকম নেটওয়ার্ক
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের টেলিকম নেটওয়ার্কগুলো ‘এসএস৭ পিংস’ নামে পরিচিত একের পর এক অনুরোধ বা রিকোয়েস্ট ব্লক করেছে। এই ধরনের পিং নিজের হোম নেটওয়ার্কের বাইরে রোমিংয়ে থাকা মোবাইলগুলোর আনুমানিক অবস্থান শনাক্ত করতে পারে।
এসব ডাটা পর্যালোচনা করেছেন এমন দু’জন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, নির্দিষ্ট কিছু ডিভাইস ট্র্যাক করার লক্ষ্যেই সম্ভবত সমন্বিতভাবে এই তৎপরতা চালানো হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এই ট্র্যাকিংয়ের চেষ্টা চালানো হয়েছিল এবং সংঘাতের শুরুর দিনগুলোতেও তা অব্যাহত ছিল। সে সময় ইরান ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী ও তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) গত এপ্রিলে কংগ্রেসকে জানিয়েছিল, ওই অঞ্চলে নিয়োজিত মার্কিন কর্মীদের ওপর নজরদারি কিংবা তাদের নিশানা করতে শত্রুপক্ষ বাণিজ্যিক লোকেশন ডাটা ব্যবহার করছে; এমন বেশ কিছু হুমকির প্রতিবেদন তারা পেয়েছে।
তবে সেন্টকম বলেছে, তারা নিজেদের বাহিনীকে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে মার্কিন অপর এক কর্মকর্তা ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ডেটা ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে হামলা চালানো হয়েছে কিংবা এটি হামলায় বড় কোনও ভূমিকা রেখেছে কি না, সেই বিষয়ে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সাধারণ টেকনিক্যাল প্যাটার্ন বা ফিঙ্গারপ্রিন্টের ওপর ভিত্তি করে ব্লক করা ট্র্যাকিং চেষ্টার অন্তত কয়েকটিকে একটি ইরানি মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মিলার বলেন, ‘‘এটি দেখে মনে হচ্ছে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ব্যবহারকারীদের টার্গেট করা হয়েছে। তারা নির্দিষ্ট কিছু ডিভাইসকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।’’
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে লন্ডনে অবস্থিত ইরানি দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
বার্তা বাজার/এস এইচ






