ঢাকা   মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা তুলতে ঘুষ দাবি, ক্ষোভে ‘ঘুষ.সাইট’ খুললেন কিশোর

Authorস্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৩ এএম

মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা তুলতে ঘুষ দাবি, ক্ষোভে ‘ঘুষ.সাইট’ খুললেন কিশোর

মায়ের মৃত্যুর পর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে গিয়ে একের পর এক দপ্তরে ঘুষের দাবির মুখে পড়েছিল একটি পরিবার। সরকারি পেনশনের টাকা পেতে যেখানে সহায়তা পাওয়ার কথা, সেখানে উল্টো ফাইল এগিয়ে নিতে গুনতে হয়েছে হাজার হাজার টাকা। নিজের পাসপোর্ট তৈরির সময়ও একই অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয় পরিবারের ১৭ বছর বয়সী সন্তান শাহেদ শরীফ আহমেদকে।

প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ঘুষের এমন অভিজ্ঞতা থেকে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন এ কিশোর। মানুষের কাছ থেকে ঘুষ দাবির অভিযোগ সংগ্রহ করে তা প্রকাশের জন্য তিনি তৈরি করেছেন ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) নামে একটি ওয়েবসাইট। উদ্দেশ্য ঘুষের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করা, দুর্নীতির চিত্র সামনে আনা এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করা।

ওয়েবসাইটটি চালুর মাত্র ৯ দিনের মধ্যেই জমা পড়েছে ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ। এসব অভিযোগে দাবি করা ঘুষের মোট অঙ্ক ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকার মধ্যে বলে জানিয়েছে সাইটটির উদ্যোক্তারা। বর্তমানে চার সদস্যের একটি মডারেশন টিম অভিযোগগুলো যাচাই ও স্ক্রিনিং করে ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করছে।

শাহেদের মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় তিনি মারা যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরির ১৩ বছরের মাথায় তার মৃত্যুর পর প্রায় সাত লাখ টাকার প্রভিডেন্ট ফান্ড তুলতে গিয়ে তিনটি সরকারি দপ্তরে মোট ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।

এর মধ্যে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে আট হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগ করেছে পরিবারটি।

শুধু এখানেই শেষ নয়। পরিবারের দাবি, কল্যাণ তহবিলের প্রায় দুই লাখ টাকা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আরও আট লাখ টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছে। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলেও জানানো হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। এ অভিজ্ঞতাই শাহেদের মধ্যে তৈরি করে তীব্র ক্ষোভ।

মায়ের পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নিজের পাসপোর্ট তৈরির সময়ও ঘুষ দিতে হয়েছে। প্রায় দেড় বছর আগে ও-লেভেল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য পাসপোর্ট করতে গিয়ে তার ফাইল আটকে রাখা হয়। পরে ১ হাজার ৫০০ টাকা ঘুষ দেওয়ার মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে কাজ সম্পন্ন হয়।

মায়ের টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষের চাপ এবং নিজের পাসপোর্টের সময় একই অভিজ্ঞতা তাকে ভাবিয়ে তোলে- কেন একজন নাগরিককে সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দিতে হবে? সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় ‘ঘুষ.সাইট’।

মাত্র দুই ঘণ্টায় ওয়েবসাইটের কাঠামো

১৭ বছর বয়সী শাহেদ বলেন, ভারতের একটি ওয়েবসাইট দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন। এরপর মাত্র দুই ঘণ্টার কোডিংয়ে ‘ঘুষ.সাইট’-এর প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করেন তিনি।

পড়ালেখার পাশাপাশি অনলাইনে ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টের কাজ শিখেছেন শাহেদ। পরে বন্ধু ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহযোগিতায় ডোমেইন কেনা হয়। গত ২১ আগস্ট ওয়েবসাইটটি আনুষ্ঠানিকভাবে লাইভ করা হয়।

শাহেদের দাবি, পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাদের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০০ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ হাজার টাকা।

শুরুতে ওয়েবসাইটটি এত দ্রুত মানুষের নজরে আসবে, তা ভাবেননি শাহেদ। তার পরিকল্পনা ছিল মূলত নিজের সিভিতে একটি কাজ হিসেবে যুক্ত করা। কিন্তু চালুর পর অল্প সময়েই বিপুলসংখ্যক অভিযোগ জমা পড়তে শুরু করে।

আইনি ঝুঁকি এড়াতে বর্তমানে অভিযোগকারীদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করছে না ‘ঘুষ.সাইট’। নির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয়ও সরাসরি প্রকাশ করা হচ্ছে না। অভিযোগগুলো যাচাই ও স্ক্রিনিংয়ের জন্য রয়েছে চার সদস্যের একটি মডারেশন টিম। প্রাথমিক যাচাই শেষে উপযুক্ত অভিযোগগুলো ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করা হচ্ছে।

শাহেদ শরীফ আহমেদ বলেন, ভবিষ্যতে আইনি সহায়তার জন্য একটি লিগ্যাল টিম গঠন করা এবং সরকারি সমর্থন পাওয়া গেলে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।

ঘুষের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনতে চাই

তার ভাষ্য, এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করা নয়; বরং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা তৈরি করা।

তিনি বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্বচ্ছতা তৈরি করা। সরকারের টাকাগুলো কোথায় যাচ্ছে এবং কোথায় অপচয় হচ্ছে, তা সবাইকে জানানো। সোজা কথায়—ঘুষের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনা, যেন সাধারণ মানুষ সেবা পেতে কোনো বাধার মুখে না পড়ে। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো হুমকি পাননি।

শাহেদ বলেন, এখন পর্যন্ত আলহামদুলিল্লাহ কোনো হুমকি পাইনি। শুরুতে সাইটটি এত ভাইরাল হবে, তা ভাবিনি। ভেবেছিলাম শুধু সিভিতে যুক্ত করব।

শাহেদের বাবা শরিফুল ইসলাম (শামীম) এ উদ্যোগে ছেলের পাশে থাকার কথা জানিয়ে বলেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি টাকা তুলতে গিয়ে তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে। বাধ্য হয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুললেও এখনো বাকি প্রায় ১০ লাখ টাকা পেতে এক লাখ টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিস মিলে টাকা না দিলে কাজ হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি জেদ ধরেছি- ঘুষ না দিয়েই টাকা তুলব। ছেলের এ উদ্যোগে আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

তবে শাহেদের পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী মো. মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, কেউ আমার কাছে আসলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করি। কাগজ নিয়ে এলে দ্রুত স্বাক্ষর করিয়ে দিই।

সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মনিকা পারভীন বলেন, ঘুষ দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা তাকে কিছু জানাননি। তিনি বলেন, কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। একই সঙ্গে পরিবারের বকেয়া টাকা দ্রুত পরিশোধের আশ্বাস দেন তিনি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান টিটু মনে করেন, ঘুষের কারণে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব অভিযোগ সামনে আসা দুর্নীতির চিত্র বুঝতে সহায়ক হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ঘুষের কারণে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পদে পদে ছড়িয়ে পড়া ঘুষের চিত্র এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। সরকার যদি প্রযুক্তিনির্ভর এই স্বচ্ছতার পদক্ষেপগুলো কাজে লাগায়, তাহলে সাধারণ মানুষ চরমভাবে উপকৃত হবে।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তরুণদের এই উদ্যোগ পুলিশের নজরে এসেছে। কোনো অনিয়ম বা ঘুষের তথ্য এলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি হলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আইনি পদক্ষেপ নেবে।

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!
Radio Barta App Screen 1
Radio Barta App Screen 2
রেডিও বার্তার সব নিউজ পেতে ডাউনলোড করুন মোবাইল অ্যাপ
ক্লিক করুন