ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সুবিধা পান মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী

Authorরেডিও বার্তা অনলাইন

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১১ পিএম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সুবিধা পান মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী

পাহাড়, সবুজ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৬৬ সালে মাত্র ২০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই বিশ্ববিদ্যালয় এখন দেশের অন্যতম শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রায় ২ হাজার ৩০০ একর আয়তনের বিশাল ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই একে ‘সৌন্দর্যের রানি’ বলে থাকেন। প্রথম দেখাতেই যে কেউ এই সৌন্দর্যের প্রেমে পড়তে বাধ্য।

তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীদের কাছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আসন পাওয়া যেন স্বপ্নপূরণের মতো। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই আসন পাওয়ার পরই অনেক শিক্ষার্থীর সামনে হাজির হয় সৌন্দর্যের আড়ালে থাকা এক কঠিন বাস্তবতা—আবাসন সংকট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৪৮টি বিভাগে নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে ২৬ হাজারের বেশি। এর বিপরীতে আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস, কটেজ কিংবা বাসাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে।

শিক্ষার্থী সংখ্যা ধাপে ধাপে বাড়লেও সে অনুযায়ী বাড়েনি আবাসনের সুযোগ। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর পুরো শিক্ষাজীবনই কেটে যায় হলের একটি আসনের অপেক্ষায়।

কটেজে শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের লড়াই

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে গড়ে উঠেছে কয়েক শ কটেজ ও মেস। ছোট ছোট কক্ষ, স্যাঁতসেঁতে ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব এসব পরিবেশেই থাকতে হচ্ছে হাজারো শিক্ষার্থীকে।

এর সঙ্গে রয়েছে পানি, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও যাতায়াতের সমস্যা। আবাসিক হলের বাইরে থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের।

ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আরমান হোসেন বলেন, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের অনেক ক্ষেত্রেই বৈষম্যের শিকার হতে হয়।
“আমরা যারা অনাবাসিক, আমরা যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টই না এমন আচরণ করা হয়। আমাদের জন্য খাবারের কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। আরও অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত। আমরা এমনভাবে পিছিয়ে আছি যেন অনাবাসিকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউই না।”

ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ হোসেন বলেন, ক্যাম্পাসের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সমস্যাও প্রকট।
“পুলিশ ফাঁড়ির এই লাইন থেকে সাউথ ক্যাম্পাস এদিকে তো বিদ্যুৎ থাকেই না বলা চলে। প্রশাসনকে বারবার বলা হয়, আমরা ব্যবস্থা নেব, নতুন হল হবে। কিন্তু কবে হবে, এর কোনো নির্দিষ্ট রোডম্যাপও আমাদের দেওয়া হয় না। সবকিছু মিলিয়ে আমরা হলের শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। আমরা এই বৈষম্যের অবসান চাই।”

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে ছাত্রীদের

আবাসন সংকটের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি পোহাতে হচ্ছে অনাবাসিক ছাত্রীদের। ক্যাম্পাসের বাইরে থাকার কারণে বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে থাকতে হয় তাদের।

পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেনাজ মজুমদার বলেন,
“আমরা যারা অনাবাসিক নারী শিক্ষার্থী, আমরা যে বাসাগুলোতে থাকি, সেখানেই নিরাপত্তার একটা বিষয় দেখি। অন্য সুযোগ-সুবিধার কথা তো নাই বললাম। আবার যাতায়াত ব্যবস্থায় নিরাপত্তার বিষয়টিও আছে।”

সমুদ্রবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল এশার অভিযোগ, আবাসন, খাবার ও যাতায়াত সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বড় একটি সময় এসব সমস্যা মোকাবিলায় চলে যায়।

তিনি বলেন,“বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য সমস্যার মধ্যে আবাসন সমস্যা অন্যতম। দূর থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ভার্সিটি লাইফ উপভোগ করার পরিবর্তে আবাসন, খাবার, যাতায়াত ব্যবস্থা ইত্যাদি সমস্যা নিয়ে বেশি উদ্বেগে থাকতে হয়। ক্যাম্পাসের বেশিরভাগ কটেজের পরিবেশও ভালো নয়। মশা, ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধের সমস্যা রয়েছে। ফলে কটেজে থাকা শিক্ষার্থীরা হলের শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ তো আছেই।”

সংকট সমাধানে চাকসুর উদ্যোগ

আবাসন সংকট নিরসনে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন চাকসুর যোগাযোগ ও আবাসন সম্পাদক মো. ইসহাক ভূঁইয়া।

তিনি জানান, ৭৫ শতাংশ অনাবাসিক শিক্ষার্থীর আবাসন সংকট নিরসনে বহুতল হল নির্মাণের পরিকল্পনা প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিত্যক্ত ভবন সংস্কারের মাধ্যমে সিট বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফরহাদ হলের এক্সটেনশনে ৮৮ জন এবং আরেকটি সংস্কারকৃত এক্সটেনশনে ১৯ জন শিক্ষার্থীকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শাহজালাল হলের পরিত্যক্ত কক্ষ সংস্কার করে প্রধান ভবন ও পুরোনো এক্সটেনশন মিলিয়ে প্রায় ৯০টি সিট বাড়ানো হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অনুযায়ী ফরেস্টির পরিত্যক্ত ভবন সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন নারী শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি।

পুরোনো শামসুন্নাহার হল সংস্কারের কাজও চলছে। একটি ব্লকের কাজ শেষ হয়েছে এবং বাকি দুটি ব্লকের জন্য ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ এসেছে। সংস্কার সম্পন্ন হলে সেখানে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী থাকার সুযোগ পাবেন।

অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের খাবার ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান ইসহাক ভূঁইয়া। তার ভাষ্য, খাবারের ভোগান্তি কমাতে হলগুলোর ‘মিল সিস্টেম’ তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সোহরাওয়ার্দী হলসহ কয়েকটি হলে এ ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে।

কটেজ ও মেসের সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কটেজ মালিকদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্তত এক হাজার অনাবাসিক শিক্ষার্থীকে আবাসন ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব প্রশাসনের কাছে উত্থাপন করা হয়েছে।

নতুন হল নির্মাণের আশ্বাস প্রশাসনের

আবাসন সংকট নিরসনে নতুন হল নির্মাণের পাশাপাশি কটেজ ব্যবস্থাপনাকে একটি নীতিমালার আওতায় আনার কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফুরকান।

তিনি বলেন,“খুব শিগগিরই আমরা কটেজ মালিকদের সঙ্গে বসব। প্রত্যেক মালিক ও টেন্যান্টের আবাসন ভাড়ার বিষয়ে একটি নীতিমালা করব। যারা কটেজে থাকে, তাদের খাওয়াদাওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা করা যায় কি না, সেটিও আমরা দেখব। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন হল নির্মাণের জন্য ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) জমা দেওয়া হয়েছে।”

তবে শিক্ষার্থীদের মতে, শুধু নতুন হল নির্মাণ করলেই আবাসন সংকটের পূর্ণাঙ্গ সমাধান হবে না। আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা, নিরাপদ যাতায়াত, মানসম্মত খাবার, বিদ্যুৎ-পানি ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিশাল আয়তন আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের ক্যাম্পাস হলেও আবাসন সংকট সেই স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নতুন হল নির্মাণের পাশাপাশি অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নই এখন শিক্ষার্থীদের প্রধান প্রত্যাশা।

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!
Radio Barta App Screen 1
Radio Barta App Screen 2
রেডিও বার্তার সব নিউজ পেতে ডাউনলোড করুন মোবাইল অ্যাপ
ক্লিক করুন