গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যখন ক্ষমতার পায়ের নিচে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল যেন এক অদ্ভুত রীতিতে পরিণত হয়েছে একজন যায়, আরেকজন আসে; কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতার চৌহদ্দিতে দাঁড়িয়ে সবাই যেন একই ভাষায় কথা বলে, একই কৌশলে ভয় দেখায়, একই দমননীতির ছক মেলে ধরে। নাম ভিন্ন, পতাকা ভিন্ন, কিন্তু চিন্তায় একই ফ্যাসিবাদী সুর। সাংবাদিকতা এই অচলায়তনে দাঁড়িয়ে বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়, আবারও উঠে দাঁড়ায় কিন্তু শাসকের চরিত্র পাল্টায় না।
১. ক্ষমতার চৌহদ্দিতে বর্বরতার পুনরাবৃত্তি
বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সাংবাদিক জাহিদুল ইসলামের ওপর হামলা, তার ফোন কেড়ে নেওয়া ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা আমাদের রাজনীতির নগ্ন রূপ উন্মোচন করেছে। একটি দল যখন গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলে, তখন তাদের কেন্দ্রস্থলে সাংবাদিক নির্যাতন এ এক ভয়াবহ পরিহাস।
এই ঘটনাটি কেবল কিছু ‘বিক্ষুব্ধ কর্মী’ বা ‘ভুল বোঝাবুঝি’র ফল নয়, এটি একটি মানসিকতার প্রতিফলন যে মানসিকতা মনে করে ক্ষমতায় থাকলে সাংবাদিকের মুখ বন্ধ রাখা যায়, তথ্যপ্রমাণ কেড়ে নেওয়া যায়। আইডি কার্ড ছিনিয়ে নেওয়া মানে পরিচয় মুছে ফেলা, ফোন কেড়ে নেওয়া মানে সত্য গোপন করা। এটি কেবল ব্যক্তি আক্রমণ নয়, গণমাধ্যমের প্রতি প্রকাশ্য ঘৃণা ও নিয়ন্ত্রণ-বাসনার বহিঃপ্রকাশ।
রাজনীতি যখন নিজের আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার স্বাদকে বড় করে তোলে, তখন এমনই হয়। ক্ষমতার বাইরে থেকে স্বাধীনতার বুলি আওড়ানো হয়, কিন্তু ক্ষমতার স্পর্শ পেলেই স্বাধীনতাকে বুটের নিচে পিষে ফেলা হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দ্বিচারিতা নতুন নয়, তবে প্রতিবারই এটি আরও নগ্নভাবে ফিরে আসে।
২. সম্পাদকীয় টেবিল থেকে দাসত্বের শেকল
আরেকটি ঘটনাও সমানভাবে উদ্বেগজনক আরটিভির সাব এডিটর মাহফুজ উদ্দিন খানকে বরখাস্ত করা। অভিযোগ, তিনি ছাত্রশিবিরের প্রেস রিলিজ প্রকাশ করেছিলেন। অথচ প্রেস রিলিজ প্রকাশ করা সাংবাদিকতার একটি স্বাভাবিক ও পেশাদার অংশ। সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেল প্রতিদিনই বিভিন্ন সংগঠনের প্রেস রিলিজ পায়, এর মধ্যে থেকে নির্বাচন করে প্রকাশ করা সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের অংশ।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তটি আর সংবাদপেশার সীমায় থাকেনি। বরখাস্তের পর থেকেই উঠে এসেছে গুরুতর অভিযোগ ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আরটিভির নিয়ন্ত্রণভার নেওয়া বিএনপি-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান অ্যাপোলো এই বরখাস্তের নির্দেশ দেন। অর্থাৎ মিডিয়া হাউসের নিয়ন্ত্রণ পাল্টেছে, কিন্তু মুক্ত সাংবাদিকতা নয়; পাল্টেছে কেবল দাসত্বের মালিকানা।
এই প্রক্রিয়াটি ভয়াবহ। যখন কোনো সাংবাদিক জানেন যে, তার কলমের ভাগ্য নির্ধারণ হবে মালিক বা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রকের ইচ্ছায়, তখন সে কলম আর মুক্ত থাকে না। এটি একটি ঠান্ডা নির্যাতন যেখানে সাংবাদিককে অর্থনৈতিকভাবে জিম্মি করে চিন্তায় দাস বানিয়ে ফেলা হয়। গণমাধ্যম তখন হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রচারণার যন্ত্র, আর সত্য চাপা পড়ে দলীয় নির্দেশনার নিচে।
৩. ফ্যাসিবাদী উত্তরাধিকার ও গণতন্ত্রের ভাঙা আয়না
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ রক্ত, ঘাম আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জন করেছিল মত প্রকাশের অধিকার। কিন্তু এখন সেই অধিকার কেবল কাগজে-কলমে বেঁচে আছে। আওয়ামী লীগ তাদের দীর্ঘ শাসনামলে গণমাধ্যমকে দলীয়করণ ও নিয়ন্ত্রণের এক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছে যেখানে ভিন্নমত মানে রাষ্ট্রদ্রোহ। আজ বিএনপি বা অন্য কোনো দল যদি সেই একই পথে হাঁটতে চায়, তাহলে তারা কেবল প্রতিপক্ষ নয়, একই ফ্যাসিবাদী ধারার উত্তরাধিকারী হিসেবেই চিহ্নিত হবে।
ফ্যাসিবাদ কেবল এক দলের নয়, এটি একটি মানসিকতা যা সমালোচনাকে ভয় পায়, প্রশ্নকে শত্রু ভাবে, এবং সত্যকে ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য’ মনে করে। এই মানসিকতা থেকেই গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটে। কারণ গণতন্ত্র টিকে থাকে মুক্ত সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের ওপর। গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে রাখা মানে জনগণের চোখে পর্দা টানা।
৪. নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা: মুক্ত রাজনীতি, মুক্ত গণমাধ্যম
নতুন প্রজন্ম এখন আর অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাস করে না। তারা দেখে, ভাবে, প্রশ্ন করে। তারা গণমাধ্যমকে দলীয় পতাকা হিসেবে নয়, সমাজের দর্পণ হিসেবে দেখতে চায়। এই তরুণ প্রজন্মই ভবিষ্যতের নাগরিক শক্তি যারা জানে, সত্যকে দমন করলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়, গণতন্ত্র ভেঙে পড়ে।
যে বা যারাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করবে তাদের রাজনৈতিক রঙ যাই হোক না কেন তারা ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে। ক্ষমতার পালাবদল মানে যেন ফ্যাসিবাদী চেতনার পুনরাবৃত্তি না হয়, বরং তা যেন হয় মুক্তির অঙ্গীকার।
উপসংহার: সত্যের পাশে দাঁড়ানোই সাংবাদিকতার ধর্ম
বাংলাদেশের রাজনীতিকে আজ দরকার আত্মসমালোচনার আয়না। যে আয়নায় তারা দেখতে পাবে, ক্ষমতা নয় নৈতিকতাই টিকে থাকে। সাংবাদিকতা কোনো পক্ষের দাস নয়; সাংবাদিকতা হলো জনস্বার্থের রক্ষক, সত্যের কণ্ঠস্বর।
রাজনীতি যদি গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের খেলায় নামায়, তবে তা শেষ পর্যন্ত নিজেদের অস্তিত্বকেই ধ্বংস করবে। কারণ যে দেশে কলম কাঁপে, সে দেশে একদিন মঞ্চও কাঁপে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে কেবল সাংবাদিকদের রক্ষা নয়, বরং গণতন্ত্রের হৃদপিণ্ডকে বাঁচিয়ে রাখা। ক্ষমতার হাতবদল হোক, কিন্তু যেন ফ্যাসিবাদী চেতনার নয় মুক্ত চিন্তার হাতবদল হয়।






