ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

রাষ্ট্র চেয়েছিল নেতা, ইউনূস দিলেন নৈতিকতা

Authorরেডিও বার্তা ডেস্ক

আপডেট: ২৫ মে ২০২৫, ১২:৫৬ পিএম

রাষ্ট্র চেয়েছিল নেতা, ইউনূস দিলেন নৈতিকতা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে যা সময়ের ধুলায় হারিয়ে গেলেও নীতির শিখা হয়ে জ্বলতে থাকে। তেমনি একটি অধ্যায়—২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাত। সে রাতে যখন রাষ্ট্র চরম সংকটে, রাজপথ উত্তপ্ত, সরকার পতনের দাবিতে উত্তাল রাজনৈতিক অচলাবস্থা, তখন সেনাবাহিনী নতুন পথ খুঁজছিল। এবং সেই সন্ধিক্ষণে যে নামটি উঠে এসেছিল, তিনি ছিলেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

প্রস্তাব ছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দেশকে সাময়িকভাবে নেতৃত্ব দেওয়া। কিন্তু ড. ইউনূস, যার সাফল্য ব্যবসায়িক নীতি, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উদ্যোগে—তিনি সেই প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দেন। কারণ তিনি জানতেন, রাজনীতি তার পথ নয়, আর নিজেকে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে না জড়ানোর সিদ্ধান্তই তার ব্যক্তিত্বের প্রকৃত প্রতিফলন।

দ্বিতীয়বার একই অনুরোধ, ভিন্ন প্রেক্ষাপট

দুই দশকের কাছাকাছি সময় পরে, ২০২৪ সালে আবার সেই প্রস্তাব। আবার এক সংকট, আবার নেতৃত্বের শূন্যতা। আর আবারও রাষ্ট্র তাকিয়ে ছিল ড. ইউনূসের দিকে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ছাত্রদের সরাসরি অনুরোধ—সব মিলিয়ে সেই “না” বলা আর সহজ ছিল না। ইতিহাস জানে, প্রথমবার তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সেনাপ্রধানকে, কিন্তু দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে দিতে পারেননি জনতার আকুতি।

এ সিদ্ধান্ত ঠিক না ভুল, সময়ই তার বিচার করবে। কিন্তু এটুকু বলা যায়—ড. ইউনূসকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতির এমন নির্ভরতা বা আকাঙ্ক্ষা আমাদের রাষ্ট্রের গভীর দুর্বলতা ও আস্থাহীনতাকে নগ্ন করে দেয়।

কেন বারবার ড. ইউনূস?

প্রশ্ন ওঠে—বাংলাদেশে হাজারো নেতা-জনপ্রতিনিধি থাকতেও কেন রাষ্ট্র বারবার একজন “অরাজনৈতিক” মানুষের দ্বারস্থ হয়?

  • কারণ দেশে নেতৃত্ব সংকট দীর্ঘদিনের।
  • কারণ যারা নেতৃত্বে আছে, তারা জনআস্থা হারিয়েছে।
  • কারণ যে রাজনীতির গায়ে লেগে আছে দমন, দুর্নীতি আর দলবাজির কলঙ্ক, সেখানে একজন ইউনূসই রয়ে গেছেন জনগণের চোখে কিছুটা নির্মল।

তবে এই আকাঙ্ক্ষা যেমন নিখাদ সম্মান, তেমনি গভীর হতাশার প্রতিচ্ছবি। এর মানে, রাষ্ট্র তার রাজনীতিকদের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।

মানহানির ভয়, আদর্শের মূল্য

যখন একজন মানুষ জীবনে অভাবনীয় আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করেন, তখন নিজের দেশের রাজনীতিতে পদক্ষেপ নেওয়া মানে শুধু দায়িত্ব নয়—ঝুঁকিও। বাংলাদেশের রাজনীতি এমন এক ক্ষেত্র যেখানে কেউ সৎ থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়, তাকে দেশদ্রোহী বলা হয়, তার চরিত্র হননই হয় প্রধান কৌশল।

ড. ইউনূস যদি দ্বিতীয়বারও না বলতেন, হয়তো তার ব্যক্তিগত মানহানি হতো না। কিন্তু রাষ্ট্র কী জানতো, যে মানুষটি দুই দশক আগেও ‘না’ বলেছিলেন, তিনি কেবল ব্যক্তিত্বের কারণে নয়, বরং এ দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

ভবিষ্যতের ভবিষ্যদ্বাণী: সত্য না শঙ্কা?

এই প্রতিবেদনের মূল বক্তব্যে রয়েছে একটি গভীর বেদনাভরা ভবিষ্যদ্বাণী—”বাংলাদেশের শুধু বয়স বাড়বে, কিন্তু সঠিক রাস্তা খুঁজে পাবে না।” এটি নিছক হতাশা নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসঙ্গতির ফল। প্রতিটি প্রজন্ম আশা নিয়ে জাগে, প্রতিবাদ করে, তারপর আবার হেরে যায়—এই বৃত্তে জাতি একশ বছর ঘুরতে পারে, যদি কাঠামোগত সংস্কার না হয়।

যেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন

ড. ইউনূস রাজনীতি করেননি, তবুও তার নৈতিক অবস্থান রাজনীতির চেয়ে বেশি শক্তিশালী ছিল। একজন মানুষ যখন ক্ষমতা নেন না, তখন সে রাষ্ট্রের চেয়ে বড় হয়। কিন্তু বারবার একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তির কাঁধে রাষ্ট্রভারের চেষ্টা আমাদের বলে দেয়, আমাদের কাঠামো দুর্বল, নেতৃত্ব প্রতিস্থাপনে আমাদের ‘ব্যাকআপ প্ল্যান’ নেই।

শেষ কথা

এই ঘটনাগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়—আমরা কি এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে প্রতিটি সংকটে আমাদের ভরসা একজন অরাজনৈতিক মানুষের ওপর? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে রাজনীতির মধ্যেই থাকবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনমানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা?

ড. ইউনূস হয়তো ফিরিয়ে দিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রস্তাব, কিন্তু রেখে গেছেন একটি আয়না। যেখানে আমরা নিজেদের দুর্বলতা, নেতৃত্বের শূন্যতা এবং আদর্শের ঘাটতি দেখতে পারি।

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!