প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২০ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে ভারতে সরকারি সফরে যেতে পারেন। ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে এখন এই সময়সীমার মধ্যেই নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী গত ১০ আগস্ট ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর পরদিন ১১ আগস্ট তিনি নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন। এরপরই মূলত তারেক রহমানের সফরের বিষয়টি সামনে আসে।
ভারতের কয়েকটি গণমাধ্যমও এই সম্ভাব্য সফরের খবর প্রকাশ করেছে।
ভারতের আরেক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটানোর লক্ষ্য নিয়ে আগামী সপ্তাহের শেষের দিকে ভারত সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভারতের সরকারি একাধিক সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ২১ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে এই দ্বিপক্ষীয় সফর অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সফরটি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো চূড়ান্ত না হলেও, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই হতে যাচ্ছে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এর আগে তারেক রহমানকে একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানান। পরে আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বিমসটেক চেয়ারম্যান হিসেবেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে যোগ দেওয়ার পুনঃআমন্ত্রণ পাঠানো হয়।
বেশ কিছুদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি জমছিল। তবে সর্বশেষ উত্তেজনার সূত্রপাত হয় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ঘিরে। ওই দিন তাঁর সরকারের পতনের দুই বছর পূর্তি ছিল। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তাঁর সরকারের পতনের পর তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর প্রথমবারের মতো তিনি সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। ভারতের এক অজ্ঞাত স্থান থেকে অডিও মাধ্যমে অনলাইনে যুক্ত হয়ে তিনি জানান, সম্ভবত ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। বাংলাদেশের আদালত তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে।
এর আগে গত ডিসেম্বরে তারেক রহমানের মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে পাঠিয়ে দিল্লি যে সৌজন্য দেখিয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমান বিএনপির নেতাদের নির্বাচনী প্রচারে ভারতকে টার্গেট নিশানা না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তিনিও নিজের বক্তব্যে সংযত ছিলেন এবং নির্বাচনী প্রচারের সময় কখনো ভারতকে আক্রমণ করেননি।
ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমান বিজয়ী হওয়ার পর তাঁকে অভিনন্দন জানানো বিশ্ব নেতাদের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম দিকের একজন। তিনি ফোন করে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক ইতিবাচক পথে এগোনোর একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।
তবে এপ্রিলের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভারতে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া তথাকথিত ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ নিয়ে যে বক্তব্য ও রাজনৈতিক বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়া হয়, তা মোটেও অস্পষ্ট বা নরম ছিল না। বিজেপি জয়ের পর এসব তথাকথিত ‘অভিবাসীকে’ আটক করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে ফেরানোর ঘটনাও ঢাকার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
চলতি বছরের জুনের শুরুতেই তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল। কিন্তু তথাকথিত ‘অভিবাসীদের আটক ও বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর’ বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও তিক্ত করে তোলে। এরপর তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় সফরে চীন যান। এটিকে দিল্লির প্রতি একটি বার্তা হিসেবেই দেখা হয়।
জুলাইয়ে দুই দেশ আবারও সম্পর্কের ছিন্ন সুতো জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে। ১ থেকে ১০ আগস্টের মধ্যে তারেক রহমানের একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে ভারতের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনকে সামনে আনা হয়েছিল। একই সময়ে ভারতীয় পক্ষ তারেক রহমানকে সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনে অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে তিনি বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবেও অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতেন।এরপর ভারতীয় পক্ষ ২১ আগস্টকে তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে প্রস্তাব করে। কিন্তু তারিখটি প্রস্তাবের পরপরই ঢাকা জানতে পারে, শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন। জানুয়ারিতে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা এক সংবাদ সম্মেলনে হাসিনার রেকর্ড করা বক্তব্য প্রচার করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর ৫ আগস্টের অনুষ্ঠানটিই ছিল প্রথমবার। অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন।
এরপর ঢাকা তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে আলোচনা স্থগিত করে এবং বিষয়টি ভারত সরকারের কাছে তোলে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান—যিনি এর আগে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন—ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকে ফোন করে প্রতিবাদ জানান। জানা গেছে যে, দোভাল তাঁকে বোঝান—এই অনুষ্ঠানটি কেবল দিল্লিতে অবস্থানরত বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য ছিল।
তবে ৫ আগস্টের ওই অনুষ্ঠানে বিদেশি সাংবাদিকদের পাশাপাশি ভারতীয় সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন। এতে ঢাকা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। দিল্লির বক্তব্য ছিল, অনুষ্ঠানটি আয়োজনের ক্ষেত্রে তাদের ‘কোনো ভূমিকা’ ছিল না এবং হাসিনার বক্তব্যকে তারা ‘সমর্থন করেনি।’ কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার, তা হয়ে গেছে।
বিশেষ করে ৫ আগস্ট, অর্থাৎ বাংলাদেশের সেই দিনটিতে শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যেদিন ঢাকায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীদের স্মরণে জুলাই জাদুঘর উদ্বোধন করা হয়। বিষয়টি বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
এরপর তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর প্রথম সরাসরি বৈঠকে তারেক রহমান তাঁকে জানান, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করা তাঁর সরকারের একটি মূল দাবি। ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে, হাসিনার প্রত্যর্পণের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে দিল্লি যদি সুস্পষ্ট ও যুক্তিসংগত কোনো জবাব না দেয়, তাহলে তারেক রহমানের পক্ষে ভারত সফর করা কঠিন হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশের এক কর্মকর্তার বরাদ দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলেছে, ‘হাসিনা ইস্যুতে ভারত সরকারের অভিপ্রায় বোঝার চেষ্টা করছি আমরা। ভারত কি তাঁকে ঢাকায় ফিরে এসে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দিতে প্রস্তুত?’
প্রায় একই সময়ে অত্যন্ত পরিকল্পিত এক পদক্ষেপে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং বা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন বাংলাদেশ সফর করেন এবং দেশটির শীর্ষ গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা দিল্লিকে শেখ হাসিনা ইস্যুতে ঢাকার উদ্বেগের প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন। সূত্রের দাবি, দুই বিষয়কে সরাসরি একসূত্রে না বাঁধলেও ভারতীয় কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে, তারা যদি বাংলাদেশকে তার ভূখণ্ড থেকে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য ঠেকাতে বলে, তাহলে দিল্লিকেও একইভাবে পাল্টা সহযোগিতা করতে হবে।
দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি হলো, শেখ হাসিনা একজন রাজনৈতিক পলাতক ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী। বাংলাদেশের যেসব উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ভারতের স্বার্থের জন্য নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠতে পারে, হাসিনার বিষয়টিকে তাদের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। ভারতের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি যদি নিজের ইচ্ছায় ফিরে যান, তাহলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আবেদন করা ছাড়া আমাদের তেমন কিছু করার থাকবে না।’
বার্তা বাজার/এআর






