শুধু লন্ডনে গিয়ে নয়, দেশে অবস্থানকালেও একাধিকবার হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন সাহাবুদ্দিন
অসুস্থতার অজুহাত দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাই কাল হলো সদ্য বিদায়ি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের। শুধু লন্ডনে গিয়ে নয়, দেশে অবস্থানকালেও তিনি একাধিকবার শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতে এ সংক্রান্ত একাধিক তথ্যপ্রমাণ রয়েছে, যা ইতোমধ্যেই সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে সাহাবুদ্দিন দাবি করেছেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলার খবরটি পুরোপুরি ভিত্তিহীন। একাধিক গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, এই ফোনালাপের পক্ষে কেউ কোনো প্রমাণ বা তথ্য দেখাতে পারলে জনগণের যে কোনো রায় মেনে নেব। আমাকে হেয় করার এটি একটি চক্রান্ত।
এছাড়া সম্প্রতি ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আসার বক্তব্য, দেশের ভেতরে ও বাইরে সরকারবিরোধী চক্রান্তের নানা তথ্য সরকারের নজরে এসেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিককালে সন্দেহজনক নড়াচড়া ও গতিবিধি একই সূত্রে গাঁথা বলে মনে করছেন সরকারের শীর্ষস্থানীয়রা। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে আর ‘ছাড়’ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ করে সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে হাসিনার যোগাযোগের পর তাকে বিশ্বাস করার আর সুযোগ ছিল না।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে এনসিপি, জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন বিভিন্ন সময় আন্দোলন চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও রাষ্ট্রপতি পদে সাহাবুদ্দিন থাক সেটি চায়নি। কিন্তু বিএনপিকে ভিন্ন একটি অংশ বুঝিয়েছে, সাহাবুদ্দিন না থাকলে নির্বাচন বিলম্বিত হতে পারে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত হতে পারে। এ কারণে বিএনপি তখন সাহাবুদ্দিনের বিপক্ষে দাঁড়ায়নি। এমনকি নির্বাচনের পর সংসদ ও সরকার গঠন করা হলেও সাহাবুদ্দিনকে স্বপদে রেখে দেওয়া হয়। অনেকের মতে, বিএনপি তাকে (সাহাবুদ্দিন) যে সম্মান দিয়েছিল, সেই সম্মানের মর্যাদা তিনি যথাযথভাবে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশেষ করে শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তিনি সেই সম্মান ও বিশ্বাসের অমর্যাদা করেছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সূত্র জানায়, মো. সাহাবুদ্দিনের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার হাতে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ আসার পর সরকার তার বিষয়ে আর কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। এমন পরিস্থিতিতে তাকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিদেশে অবস্থানরত স্পিকারকে সফর সংক্ষিপ্ত করে অবিলম্বে দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের ‘বার্তা’ দেওয়া হয়। শুক্রবার বিকালে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এএসএম বাহাউদ্দিন বঙ্গভবন থেকে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরকৃত পদত্যাগপত্র নিয়ে সংসদ সচিবালয়ে যান। সেখানে ৫টা ১ মিনিটে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
একাধিক সূত্রের দাবি, মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান মো. সাহাবুদ্দিন। সেখানে অবস্থানকালে অতি গোপনীয়তা রক্ষা করে ভারতে অবস্থানরত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন তিনি। ১৮ মে দেশে ফেরার পর একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এ তথ্য উদ্ঘাটনে মাঠে নামে। এরই মধ্যে সম্প্রতি শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরবেন। ফলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ‘চোরাগোপ্তা’ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ কিছু এলাকায় নানা তৎপরতা চালায়। শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রপতির গোপন তৎপরতাসহ নানা সমীকরণের যোগসূত্র পায় সরকার। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মো. সাহাবুদ্দিনকে ঝুঁকি হিসাবে চিহ্নিত করে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অফিশিয়াল বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার পরেও এ বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজি হননি।- সূত্র : যুগান্তর






