বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় একযোগে ৩০০টি আসনে। প্রতিটি আসন থেকে একজন করে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৫। গড়ে আসনপ্রতি ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ লাখের বেশি। অর্থাৎ একটি আসনে যে প্রার্থী সর্বোচ্চ চার লাখ ভোটারের সমর্থনে নির্বাচিত হন, তিনিই পরবর্তীতে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন ও দলীয় প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকেন। এ প্রসঙ্গে সচেতন ভোটার উদ্বেগ জানিয়েছেন- মাত্র চার লাখ ভোটে নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধি (এমপি) কীভাবে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের দেশে নির্বাহী প্রধান হয়ে ওঠেন? ২৯৯ আসনের ভোটারের মনে প্রশ্ন জাগে, কেন নির্বাচিত সেই প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি ভোট দিতে পারেননি তারা।
দেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেন না। তারা ভোট দেন তাদের নিজ নিজ আসনের প্রার্থীকে। যে প্রার্থী সেই আসনে সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর সংসদে যে দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তাদের নেতাই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ফলে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি গোটা দেশবাসীর ভোটে নয়, বরং (সংসদীয়) সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের নির্বাচনি বিধি অনুযায়ী, এক আসনের ভোটার অন্য আসনের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন না। ফেনীর ভোটার বগুড়ার হেভিওয়েট প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন না, রংপুরের ভোটার ঢাকা-১৫ আসনের তুমুল জনপ্রিয় প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন না। ফলে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী বা দলীয় প্রধানকে সরাসরি ভোট দেয়ার সুযোগ থাকে কেবল তার নিজ আসনের ভোটারদের। অন্য ২৯৯টি আসনের ভোটাররা তাকে সরাসরি ভোট দেয়ার সুযোগ পান না।
এর ফলে একটি বাস্তব রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়। দলীয় প্রধান যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তার কৃতজ্ঞতাবোধ বেশি থাকে তার নিজ আসনের ভোটারদের প্রতি-যারা তাকে সরাসরি ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছেন। একই সঙ্গে তার দলের সংসদ সদস্যদের প্রতিও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা বাড়ে, কারণ তাদের জয়ের ওপর নির্ভর করেই তার নেতৃত্বাধীন দল/জোট সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। কিন্তু যেসব আসনে তার দলীয় প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন, কিংবা যেখানে ভোটাররা ব্যালটে ভিন্ন রাজনৈতিক মতের পক্ষে গণরায় দিয়েছেন, সেই আসনগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক ধীরে ধীরে কর্কশ হয়ে উঠে।
স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বহুবার অভিযোগ উঠেছে যে কিছু নির্দিষ্ট জেলা বা অঞ্চল-যেমন ফেনী, বগুড়া, গোপালগঞ্জ, রংপুর, কিশোরগঞ্জ-দেশের শীর্ষ নেতাদের সংসদীয় আসন হওয়ার কারণে উন্নয়ন ও অবকাঠামো বিনিয়োগে বিশেষ অগ্রাধিকার পেয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী যদি তার নিজ আসন ও শক্ত ঘাঁটির প্রতি বেশি পরিমাণে কৃতজ্ঞ ও মনোযোগী হন, তবে অন্য অঞ্চলের মানুষ নিজেদের বঞ্চিত ভাবতে পারেন।
চলমান এই ব্যবস্থায় আইনি অসঙ্গতি নেই। এটি সংসদীয় ব্যবস্থায় স্বাভাবিক হলেও এর পরিণতি তিক্ত। এখানে ভোটারের প্রশ্নটি নৈতিক ও কাঠামোগত। সরকারপ্রধান দেশবাসীর সরাসরি ভোটে নির্বাচিত না হলে তার দায়বদ্ধতা তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে যায় নাকি সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রতিনিধিত্বের এই পরোক্ষ পদ্ধতিই যথেষ্ট?
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে ভোটারবান্ধব পদ্ধতি প্রচলিত। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা তাদের কংগ্রেস প্রতিনিধি ছাড়াও প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর জন্য আলাদা ভোট দেন। ফ্রান্সের ভোটাররা পার্লামেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি সরাসরি ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন। জার্মানিতে নির্বাচিত সরকারপ্রধানের বৈধতা কেবল একটি ছোট নির্বাচনি এলাকার ভোটারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না।
রাজধানী ঢাকার নারী ভোটার তাছলিমা আক্তার বলেন, বাংলাদেশে যদি এমন ব্যবস্থা থাকত যেখানে ভোটাররা স্থানীয় এমপি প্রার্থীর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীকেও ভোট দিতে পারতেন, তাহলে গণমানুষের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর দায়বদ্ধতা দেশজুড়ে বিস্তৃত হতে বাধ্য হতো। এতে নির্দিষ্ট আসনের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে ম্যান্ডেট পেতেন সেই প্রধানমন্ত্রী। ফলে গোটা দেশের ভোটারদের প্রতি তার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা আরও স্পষ্ট হতো।
তবে এ কথাও সত্য যে সংসদীয় ব্যবস্থার মূল দর্শন হলো নির্বাচিত আইনপ্রণেতা বা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকার গঠন। এখানে সরকারপ্রধানের বৈধতা আসে সংসদের আস্থা থেকে, মাঠপর্যায়ের ভোট থেকে নয়। ফলে চার লাখ ভোটারের আসন থেকে নির্বাচিত হয়েও ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের দেশে প্রধানমন্ত্রী হওয়া সাংবিধানিকভাবে বৈধ। কিন্তু গণতন্ত্রে বৈধতা ও ন্যায্যতার প্রশ্ন সবসময় এক হয় না।
শেষ পর্যন্ত বিতর্কটি সংখ্যায় নয়, জনপ্রতিনিধিত্বের গভীরতার। নাগরিকরা কি কেবল তাদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে জাতীয় নেতৃত্ব নির্ধারণে সন্তুষ্ট, নাকি তারা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের অধিকার চান-এই প্রশ্নই ভবিষ্যতে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।
বার্তা বাজার/এমএমএইচ






