কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনে কওমি সনদের দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন এবং কওমি শিক্ষাব্যবস্থার স্বকীয়তা ও মর্যাদা রক্ষার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) গাজীপুরের কাপাসিয়ার দেওনা দাওয়াতুল হক মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী (দেওনা পীর) প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব দাবি জানান।
তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা একটি বিশেষায়িত শিক্ষা ব্যবস্থা। আধুনিকায়নের নামে যারা এতে পরিমার্জনের কথা বলেন, তারা মূলত এ শিক্ষাকে সনদনির্ভর ব্যবস্থায় পরিণত করতে চান। অথচ কওমি শিক্ষা থেকে হাফেজ ও আলেমদের জন্য দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ রয়েছে, যা অন্য কোনো শিক্ষা ব্যবস্থায় তেমনভাবে নেই। এমনকি দেশের রেমিট্যান্স খাতেও কওমি শিক্ষিত হাফেজ-আলেমদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কওমি শিক্ষার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বীকৃতি অক্ষুণ্ণ রেখে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে কওমি শিক্ষার্থীদের নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এতে একদিকে ধর্মীয় শিক্ষার মান উন্নত হবে, অন্যদিকে কওমি শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ভারতের উত্তরাখণ্ডের সাবেক মন্ত্রী আওলাদে রাসুল (সা.) মাওলানা মাসউদ মাদানী। এছাড়া আরও বক্তব্য রাখেন মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরী, মাওলানা শিব্বির আহমদ রশিদ (কিশোরগঞ্জ), মাওলানা আব্দুল বাসেত খান (সিরাজগঞ্জ), মাওলানা লুৎফর রহমান ফরায়েজী, মুফতি রেজওয়ান রফিকী, মাওলানা আলী আজম (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), মাওলানা মেরাজুল হক মাযহারী, মাওলানা দ্বীন মোহাম্মদ আশরাফ, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান ও মুফতি ইমরনুল বারী সিরাজী প্রমুখ।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, মাওলানা মুস্তাকীম বিল্লাহ হামিদী ও মুফতি নজরুল ইসলাম।
বক্তারা বলেন, দেশের বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান ধারক হিসেবে কওমি মাদ্রাসা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য শিক্ষার্থী বিনামূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে, যা সমাজের নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিশেষ সহায়ক।
কওমি শিক্ষক পরিষদের মহাসচিব মাওলানা মুস্তাকীম বিল্লাহ হামিদী বলেন, কওমি মাদ্রাসায় প্রদত্ত দান ও অনুদানকে আয়করমুক্ত রাখা প্রয়োজন। কারণ এ ধরনের অনুদান জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হয় এবং রাষ্ট্রের সামাজিক উন্নয়নে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। দানকারীদের উৎসাহিত করতে এ খাতে কর অব্যাহতি প্রদান সময়োপযোগী।
সম্মেলনে বক্তারা নবী-রাসুল ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনচরিত নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং তা ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের সমালোচনা করেন। তারা বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানছে। এসব কার্যক্রম বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান সমাজে অপসংস্কৃতির বিস্তার উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে, যা দেশের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর ফলে তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংবিধানের ২৩ নং অনুচ্ছেদ সংশোধনের দাবি জানান তারা।
এছাড়া শিক্ষার সর্বস্তরে ইসলামি শিক্ষার প্রসার এবং কওমি শিক্ষাব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষায় সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদ সংশোধনের দাবি তোলা হয়। বক্তারা বলেন, বর্তমান ধারায় একমুখী সেক্যুলার শিক্ষার প্রতিফলন থাকায় শিক্ষা কমিশন ও নীতিমালায় তা প্রভাব ফেলছে।
সম্মেলন থেকে ওয়াকফ আইনের ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নং ধারা বাতিলসহ পুরো ওয়াকফ আইন ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ওয়াকফ দলিল নিবন্ধন খরচ হেবার ঘোষণাপত্রের মতো নির্ধারণ এবং মুসলমানদের পারিবারিক বিষয় নিষ্পত্তিতে স্বতন্ত্র শরিয়াহ আদালত প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়।
বার্তা বাজার/এমএমএইচ






