দেশজুড়ে ফের শুরু হয়েছে বিদ্যুতের চরম ভেলকিবাজি। একদিকে চৈত্রের দাবদাহে হাঁসফাঁস অবস্থা, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং সব মিলিয়ে জনজীবনে নেমে এসেছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। তবে এই লোডশেডিংয়ের চিত্র সমবণ্টন হচ্ছে না। রাজধানীসহ জেলা শহরগুলোতে দিনে এক থেকে দেড় ঘণ্টার লোডশেডিং দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চললেও, এর পুরো মাশুল গুনতে হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে। পল্লি অঞ্চলে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
খুলনা, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে লোডশেডিং পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। তুলনামূলকভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হলেও গ্রামের চিত্র সর্বত্রই শোচনীয়। বিদ্যুতের এই যাওয়া-আসায় বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থদের ভোগান্তির সীমা ছাড়িয়েছে। চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বোরো সেচ, ক্ষুদ্র শিল্প ও বাণিজ্য।
জ্বালানি সংকট ও বকেয়ার চাপে ধুঁকছে উৎপাদন
সরকারি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যমতে, দেশে লোডশেডিং এখন দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার দ্বিগুণ হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে সরকার তা কাজে লাগাতে পারছে না। গ্যাস ও জ্বালানি তেলের চলমান সংকটের সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে কয়লার স্বল্পতা। এতে বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকেই দিনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। পাশাপাশি নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আসাও বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পরিচালক (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম জানান, মূলত চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ার ও কক্সবাজারের মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে কম যুক্ত হচ্ছে। কয়লা আমদানিতে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া পটুয়াখালীর নোরিনকো কেন্দ্রটি পরীক্ষামূলক উৎপাদনে থাকলেও কয়লা সংকটে মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছে। রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ থাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

তবে আশার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “রামপালের ত্রুটিযুক্ত ইউনিটটি আজ রাতেই চালু হতে পারে। এরপর হয়তো খানিকটা স্বস্তি মিলবে।” শহর ও গ্রামের বৈষম্যের বিষয়ে তিনি সরাসরি স্বীকার করে বলেন, “আমরা শহরে লোডশেডিংকে নিরুৎসাহিত করছি।”
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পিডিবি চলতি মাসের জন্য ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চাইলেও পাচ্ছে মাত্র ৯২-৯৩ কোটি ঘনফুট। এছাড়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পাওনা থাকায় উদ্যোক্তারা তেল আমদানির ঋণপত্র খুলতে পারছেন না। ফলে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও বাধ্য হয়ে কম চালানো হচ্ছে।
গত রোববার সর্বোচ্চ চাহিদার (১৫,৯৫০ মেগাওয়াট) বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ২,১০৩ মেগাওয়াট। পহেলা বৈশাখের ছুটিতে চাহিদা কম থাকলেও এক হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। সর্বশেষ বুধবার বিকেল ৪টায় সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রায় ১,৯০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। সন্ধ্যার পর এই ঘাটতি আরও বাড়ছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও ভয়াবহ। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে উঠে এসেছে লোডশেডিংয়ের জেলাভিত্তিক বিস্তারিত হালচাল:
বরিশাল: আসা-যাওয়ার খেলায় বিপর্যস্ত মানুষ
নববর্ষের প্রথম দিনেই প্রায় ১২ ঘণ্টা অন্ধকারে ছিলেন বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলাবাসী। পিরোজপুর সদরের উদয়কাঠি গ্রামের বেলায়েত হোসেন সরদার বলেন, “বিদ্যুৎ যেন আসা-যাওয়ার খেলা খেলছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ-ছয়বার বিদ্যুৎ চলে যায়। একবার গেলে এক-দেড় ঘণ্টা পর আসে।”
বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্ণকার জানান, অফপিক আওয়ারে চাহিদা ৮৫-৯০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৩৫-৪০ মেগাওয়াট। পিক টাইমে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ বাড়ে না। কেন্দ্র-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, ৪৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাচ্ছেন মাত্র ২০ মেগাওয়াট।
পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএম মো. আলতাপ হোসেন জানান, ৬০ মেগাওয়াটের চাহিদার বিপরীতে গ্রিড থেকে মিলছে মাত্র ৩০-৪০ মেগাওয়াট। বরগুনায় গ্রাহকের ১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪-সাড়ে ৪ মেগাওয়াট।
রংপুর: সেচ ও ব্যবসায় ধস
রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জিএম আশরাফ আলীর দাবি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় লোডশেডিং দেওয়া হয় না। তবে গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে পরিস্থিতি বেশ খারাপ। গাইবান্ধা সদরের খোলাহাটি গ্রামের কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বোরো চাষে জমিতে সব সময় পানি রাখতে হয়। কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ ঠিকমতো না থাকায় ধানের ক্ষতি নিয়ে অনেক চিন্তায় আছি।”
শহরের ব্রিজ রোডের ব্যবসায়ী ছবেদুল মিয়া জানান, দিনে চারবার বিদ্যুৎ যাওয়ায় ফ্রিজের খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হওয়ার পথে। কুড়িগ্রামের শুভ দাস নামের এক ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি এবং ফ্রিল্যান্সার অমিত পাল জানান, ঘন ঘন বিদ্যুতের কারণে ক্রেতাদের কাজ সময়মতো বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। নেসকো কুড়িগ্রাম কার্যালয় জানিয়েছে, জেলায় ৭০-৮০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ৪০-৪৫ মেগাওয়াট।
রাজশাহী: গভীর নলকূপ ও অটোচালকদের হাহাকার
পিডিবি বগুড়ার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এমদাদুল হকের দাবি, ৯৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। তবে বাস্তবে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যেই পাঁচবার লোডশেডিং হয়েছে শহরে। নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁর বিশেষ করে লালপুর, রাণীনগর, সিংড়া ও উল্লাপাড়ায় দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে।
লালপুরের ফুলবাড়ী গ্রামের গৃহিণী তাবাছুম জান্নাত বলেন, “শুধু রাতেই পাঁচ-ছয়বার বিদ্যুৎ যায়। গরমে বাচ্চারা ঘুমাতে পারে না, পড়াশোনা ও সংসারের কাজও শিকেয় উঠেছে।” একই এলাকার অটোচালক সোহেল আলী বলেন, “রাতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে না। ভাড়াও মারতে পারছি না, সংসার চালানোই মুশকিল।”
নওগাঁর রানীনগরের কসবাপাড়া গ্রামের গভীর নলকূপের মালিক আনিছুর খান বলেন, “২৯০ বিঘা জমিতে বোরো চাষ হচ্ছে। গত ১৫ দিন ধরে সেচ দিতে পারছি না। ধান চরম ক্ষতির মুখে।”
সিলেট: দিনের অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎহীন
সরকারি হিসাবে সিলেট বিভাগে ঘাটতি ৩০ শতাংশ বলা হলেও জগন্নাথপুর, জুড়ী, ধর্মপাশা, মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলায় দিনের অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না। সিলেট বিদ্যুৎ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন জানান, জেলায় ১৫০-১৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে ১১০ মেগাওয়াট। ধর্মপাশার গাছতলা বাজারের ব্যবসায়ী আশরাফুল আলম জানান, দিনে অন্তত পাঁচবার আড়াই ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসা লাটে ওঠার উপক্রম।
চট্টগ্রাম: কৃষকদের তোপের মুখে ব্লক ম্যানেজাররা
কুমিল্লার হোমনা, মেঘনা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে জনজীবন বিপর্যস্ত। হোমনায় ২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে ৯-১০ মেগাওয়াট। বাঞ্ছারামপুর জোনাল অফিসের এজিএম মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সদরে ৬৭% এবং ফরদাবাদে ৪৫% লোডশেডিং চলছে।
রূপসদী দক্ষিণপাড়ার ব্লক ম্যানেজার সালেহ আহমেদ চরম অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “জমিতে সেচ দিতে না পারায় কৃষকরা আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে।” ফরদাবাদ গ্রামের শিক্ষিকা রাশিদা আক্তার বলেন, “২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬-১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। গরমে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে।”
ঢাকা: উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে ক্ষুদ্র শিল্পে
ঢাকা বিভাগের জেলা শহরগুলোতে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হলেও আলফাডাঙ্গা, গোয়ালন্দ, বাজিতপুর, বোয়ালমারী, শিবালয় ও লৌহজং উপজেলায় চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ মিলছে। কিশোরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ৯০ মেগাওয়াটের বিপরীতে মিলছে ৬০ মেগাওয়াট। মুন্সীগঞ্জ শহরের ছাত্রী নাফিসা বিনতে উর্বনা জানান, পড়াশোনার সময়ই বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। মুক্তারপুরের ব্যবসায়ী হেলালউদ্দিন জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় ওয়েল্ডিং, কাঠের কারখানা ও প্রিন্টিং প্রেসে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পানি তোলার মোটর চালানো যাচ্ছে না।
ফরিদপুরের বোয়ালমারীর বিকাশ এগ্রো ফার্মের এমডি বিজয় সাহা জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চাল উৎপাদন ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। জেনারেটর চালানোর মতো তেলও পাওয়া যাচ্ছে না।
খুলনা: তীব্র বৈষম্য শহর ও গ্রামে
খুলনা মহানগরীতে মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার বিকেল পর্যন্ত পাঁচবার লোডশেডিং হয়েছে। তবে সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও মাগুরায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও ভয়াবহ। ওজোপাডিকোর প্রধান প্রকৌশলী এটিএম তারিকুল ইসলাম জানান, ১৭৮ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে। মাগুরার কমলাপুর ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মুসাফির জানান, গ্রামে একবার বিদ্যুৎ গেলে তিন-চার ঘণ্টা পর আসছে। যশোরের অভয়নগরে ৩৭-৩৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে ২৫-২৬ মেগাওয়াট। আবাচন্ডিপুর গ্রামের মিজানুর রহমান জানান, গ্রামে প্রতিবার দেড় থেকে আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, অথচ পৌর সদরে তা ৩০-৬০ মিনিট।
ময়মনসিংহ: বিপাকে মাছচাষিরা
ময়মনসিংহ জেলায় ৫০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি থাকছে। তারাকান্দা, ফুলপুর, ধোবাউড়া, ফুলবাড়িয়া ও মুক্তাগাছা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি ভয়াবহ। এই লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন জেলার মৎস্য খামারিরা। চর বড়বিলা এলাকার মাছচাষি সারোয়ার হোসেন বলেন, “বৈশাখ মাসে পুকুরে সারাক্ষণ পানি দিতে হয়। দিনের বড় সময় লোডশেডিং থাকায় সেচ বন্ধ থাকছে। এতে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রেণু ও পোনা উৎপাদনকারীদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।”
সব মিলিয়ে বিদ্যুতের এই চরম সংকটে গ্রামের সাধারণ মানুষ, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। দ্রুত কয়লা ও জ্বালানি সংকট নিরসন না হলে সামনের দিনে এই দুর্ভোগ আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।






