হ্যান্ডেলবার থেকে এক হাত সরিয়ে হঠাৎই নাক চেপে ধরলেন রিকশাচালক হারুণ মিয়া। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “আর কইয়েন না। সারাডা শহরে গন্ধ আর গন্ধ। গন্ধ মানে পচা গন্ধ। নাক চাইপ্পা চলন লাগে। খালি আমি না, হগলেঅই দেখবেন নাহে ধইরা যায়। কেউ কেউ দেখবেন মাস্ক লাগায়া রাখছে।”
এভাবেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দুর্গন্ধের চিত্র তুলে ধরেন তিনি। মেড্ডা (সিও অফিস) এলাকায় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে কথা হয়।
একই এলাকার বাসিন্দা চয়ন বিশ্বাসও জানান একই ধরনের দুর্ভোগের কথা। তিনি বলেন, “ঘর থেকে বের হলেই চোখে ময়লা পড়ে। সড়কের পাশে ফেলে রাখা ময়লার জায়গাটুকু আগে থেকেই শ্বাস বন্ধ করে পার হই। কখনো মনে না থাকলে দুর্গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।”
সম্প্রতি সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সড়ক, রেল কিংবা নৌপথ—যেভাবেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে প্রবেশ করা হোক না কেন, সড়কের পাশে চোখে পড়ে ময়লার স্তূপ। এসব বর্জ্য থেকে ছড়িয়ে পড়া দুর্গন্ধে পৌর এলাকার বিভিন্ন সড়কে চলাচল করাই হয়ে উঠেছে কষ্টকর।
সড়কপথে শহরে প্রবেশের সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অদূরে কাউতলী এলাকায় দেখা যায় বড় ময়লার স্তূপ। রেলস্টেশন থেকে শহরে আসার পথেও রয়েছে একাধিক ভাগাড়। নৌপথে গোকর্ণঘাটে নামলেই চোখে পড়ে বিশাল বর্জ্যের স্তূপ। স্থানীয় বাসিন্দারা এটি অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন করলেও এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
শুধু আবাসিক এলাকা নয়, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যালয়ের সামনেও ময়লা-আবর্জনার স্তূপ সৃষ্টি হয়েছে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনেই রয়েছে একাধিক ভাগাড়, যা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট করে। শহরের ব্যস্ততম টিএ রোডের মঠের গোড়ার সামনেও রয়েছে ডাস্টবিন। এ ছাড়া হালদারপাড়া, মৌলভীপাড়া, মধ্যপাড়া, পাইকপাড়া, শিমরাইলকান্দিসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কের পাশে অন্তত অর্ধশত ময়লার স্তূপ দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পৌরসভার বাড়ি বাড়ি গিয়ে বর্জ্য সংগ্রহের কার্যক্রম সীমিত ও অনিয়মিত। ফলে অধিকাংশ বাসিন্দা নির্ধারিত ডাস্টবিন কিংবা খোলা জায়গায় ময়লা ফেলছেন। কোথাও একজন ময়লা ফেললে পরবর্তীতে অন্যরাও একই স্থানে বর্জ্য ফেলছেন। এভাবে শহরের শতাধিক স্থান ধীরে ধীরে অস্থায়ী ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় এসব স্থান থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের এলাকায়।
নদী, পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন ‘তরী বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, “প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভায় এখন স্বস্তির নিঃশ্বাসও ফেলা যায় না। শহরজুড়ে ময়লার দুর্গন্ধ। বলা যায়, পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একেবারেই ভেঙে পড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিষয়টি নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা কখনো লোকবল সংকট, কখনো গাড়ির স্বল্পতার কথা বলেন। ফলে দুর্ভোগে পড়েছেন শহরবাসী। সড়কের পাশে ফেলে রাখা ময়লা ড্রেনে পড়ে মেড্ডা, ফুলবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতাও সৃষ্টি করছে।” একই সঙ্গে তিনি বর্জ্য যেখানে-সেখানে না ফেলার বিষয়ে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার প্রশাসক উপসচিব শরিফুল ইসলাম বলেন, “কিছু এলাকার ময়লা-আবর্জনা অপসারণের বিষয় আমি নিজেই তদারকি করি। মূল সমস্যা হলো লোকবলের অভাব। আধুনিক যন্ত্রপাতিও নেই। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্যের পরিমাণও বেড়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।”
শহরবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটানো হবে। অন্যথায় দুর্গন্ধ, পরিবেশ দূষণ ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যা আরও প্রকট হয়ে জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।






