চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) এক সিনিয়র নারী শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ্য করে কুরুচিপূর্ণ ও নারীবিদ্বেষী মন্তব্য এবং সাইবার হয়রানির অভিযোগ উঠেছে একই বিভাগের কয়েকজন জুনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী রত্না খাতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং বিভাগের ব্যাচ প্রতিনিধি (সিআর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযুক্তরা একই বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান মারুফ, লাবণ্য, তানভীর, জোবাইদা ও আবিরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ আগস্ট ‘সিইউ ইনসাইডার’ নামের একটি ফেসবুক পেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র-জুনিয়র শিষ্টাচার ও আচরণ নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট প্রকাশিত হয়। পোস্টটি জুনিয়র-সিনিয়র শিক্ষার্থীদের একটি সম্মিলিত মেসেঞ্জার গ্রুপে শেয়ার করাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। সেখানে সিনিয়র শিক্ষার্থীদের পারিবারিক শিক্ষা ও আচরণ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাচ প্রতিনিধি হিসেবে রত্না খাতুন তার সহপাঠীদের নিয়ে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন। পরে তিনি মেসেঞ্জার গ্রুপে অপ্রয়োজনীয় তর্কে না জড়ানোর অনুরোধ জানান। তবে এরপর তাকে লক্ষ্য করে একাধিক আপত্তিকর বার্তা পাঠানো হয় বলে অভিযোগ তার।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরবর্তীতে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো যোগাযোগ না থাকা সত্ত্বেও কয়েকজন জুনিয়র শিক্ষার্থী তাকে উদ্দেশ্য করে আলাদা একটি মেসেঞ্জার গ্রুপ খোলেন। সেখানে তার সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ ও যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই গ্রুপের এক সদস্য স্ক্রিনশট ভুক্তভোগীকে পাঠালে বিষয়টি তার নজরে আসে।
ঘটনাটি জানার পর রত্না খাতুন তার বিভাগের সভাপতিকে বিষয়টি অবহিত করেন। বিভাগীয় সভাপতির পরামর্শে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও চাকসুর আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে প্রক্টর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন তিনি।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, প্রক্টর কার্যালয় থেকে অভিযুক্তদের কারণ দর্শাতে বলা ও ডেকে পাঠানোর পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং ‘পাঁচ আসামি’ নামে একটি নতুন মেসেঞ্জার গ্রুপ খোলা হয়। সেখানে তার একটি ব্যক্তিগত ছবি অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ করে গ্রুপের কভার ফটো হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং প্রক্টর কার্যালয় নিয়েও অবমাননাকর মন্তব্য করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রত্না খাতুন বলেন, ‘ডিপার্টমেন্টের সিআর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ছাড়া তাদের সঙ্গে আমার কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না। অথচ আমাকে টার্গেট করে অত্যন্ত জঘন্য ভাষায় সাইবার হ্যারাসমেন্ট করা হয়েছে। প্রক্টর অফিসে জানানোর পরও তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি। বরং নতুন গ্রুপ খুলে আমার ছবি ব্যবহার করে অপমানজনক আচরণ চালিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণ ক্ষমা বা ফরমাল সরি বলে এই ধরনের মানসিক নির্যাতনের সমাধান হতে পারে না। আজ আমি শিকার হয়েছি, বিচার না হলে কাল অন্য কোনো নারী শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার হতে পারে। আমি প্রশাসনের কাছে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
অভিযুক্ত শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান মারুফ বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সহ-ত্রাণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি গ্রুপে ছিলাম সত্য। ওই শিক্ষার্থীর ছবি বিকৃত করিনি। গ্রুপে তর্ক করার সময়ও আমি ছিলাম। এরপরে আমি আর কিছু করিনি। আমার অজান্তেই বাকি চারজন গ্রুপ বানিয়ে সেখানে আমাকে যুক্ত করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে যদি আমার কোনো দোষ থাকে, তাহলে সেটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়; ছাত্রদলের নয়।’
এ বিষয়ে চাকসুর আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বী তৌহিদ বলেন, ‘প্রক্টর অফিসের মাধ্যমে অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে। বিভাগে সমাধান না হলে বিষয়টি র্যাগিং ও বুলিংবিরোধী সেলে তোলা হবে।’
তিনি আরও বলেন, বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে ভুক্তভোগীকে নিয়ে সাইবার ট্রাইব্যুনালে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে চাকসুর ফ্রি লিগ্যাল এইড সেলের মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনি সহায়তার পাশাপাশি নারী আইনজীবীর সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বলেন, ‘অভিযোগটি আমরা পেয়েছি। ক্যাম্পাসে কোনো শিক্ষার্থীকে সাইবার হ্যারাসমেন্ট বা সামাজিকভাবে হেনস্তা করার সুযোগ নেই। তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’






