ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে এক অভিনব ‘প্রপাগান্ডা যুদ্ধ’। নেতাদের বক্তব্যের আগপিছ কেটে ফেলে তৈরি করা হচ্ছে বিভ্রান্তিকর ভিডিও ক্লিপ। উদ্দেশ্য—ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা। ডিসমিসল্যাবের গবেষণায় উঠে এসেছে এমন ভয়ানক তথ্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করলেই হয়তো আপনার চোখে পড়ছে কোনো রাজনৈতিক নেতার জ্বালাময়ী বক্তব্য। যেখানে তাকে বলতে শোনা যাচ্ছে—ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর কোনো কথা। ভিডিওর নিচে হাজারো মানুষের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। কেউ তাকে ‘নাস্তিক’ বলছেন, কেউ বলছেন ‘মুরতাদ’। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনি যা দেখছেন তা হয়তো সত্য নয়?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একশ্রেণীর অসাধু চক্র রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যকে খণ্ডিত করে ধর্মীয় রঙ চড়িয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। সম্প্রতি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব (Dismislab)-এর এক গবেষণায় এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
ভাইরাল ভিডিওর আসল রহস্য
ডিসমিসল্যাব সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া পাঁচটি ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে। এর মধ্যে দুটি ভিডিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১. বিএনপি নেতা হাবিব উন নবী খান সোহেল: একটি ১০ সেকেন্ডের ক্লিপে তাকে বলতে শোনা যায়, “ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিতরা প্রয়োজনমতো এসে বায়তুল মোকাররমে পূজা দিতে পারবে…”।
২. বিএনপি নেত্রী পাপিয়া: ১২ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিওতে সাবেক এমপি পাপিয়াকে বলতে শোনা যায়, “শরীরের জন্য তামাক বড়ই ক্ষতিকর, আর ধর্মের জন্য ইসলাম বড়ই ক্ষতিকর”।
আসল সত্য কী?
ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ বলছে, এই ভিডিওগুলোতে কোনো ‘ডিপফেক’ বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়নি। বরং এখানে প্রয়োগ করা হয়েছে ‘ডিকনটেক্সচুয়ালাইজেশন’ (Decontextualization) বা প্রেক্ষাপট বিচ্ছিন্নকরণের কৌশল। অর্থাৎ, বক্তা হয়তো দীর্ঘ কোনো আলোচনায় একটি উদাহরণ দিচ্ছিলেন বা অন্যের উদ্ধৃতি দিচ্ছিলেন, কিন্তু এডিট করে তার বক্তব্যের আগের এবং পরের অংশ ফেলে দেওয়া হয়েছে। ফলে মনে হচ্ছে, তিনি নিজেই ধর্মবিরোধী কথা বলছেন। অথচ পূর্ণাঙ্গ ভিডিও দেখলে বোঝা যায়, বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কেন ছড়ানো হচ্ছে এসব ভিডিও?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ধর্ম একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও শক্তিশালী আবেগের জায়গা। নির্বাচনের আগে ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে এবং প্রতিপক্ষকে ‘ধর্মবিদ্বেষী’ হিসেবে প্রমাণ করতে এই কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের (ULAB) গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সুমন রহমান এ বিষয়ে বলেন, “নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের প্রতিটি কথা রেকর্ড করা হচ্ছে। এরপর সেখান থেকে নির্দিষ্ট অংশ কেটে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এটা এক ধরনের প্রতারণা। একজন ভোটার যখন ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার স্বাধীন ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ হয়।”
তিনি আরও বলেন, “এটা এখন প্রপাগান্ডা ওয়ারফেয়ার বা প্রচার যুদ্ধের অংশ। ভুল তথ্য দিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করে ভোটের মাঠ প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।”
সুমন রহমান
কারা করছে এসব?
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কেবল বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকরাই নয়, ভিউ বা রিচ বাড়ানোর আশায় অনেক সাধারণ কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং প্রবাসী ভ্লগাররাও জেনে বা না জেনে এসব বিভ্রান্তিকর ভিডিও শেয়ার করছেন। ভিডিওর ক্যাপশনেই উসকানিমূলক কথা লিখে দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষকে দ্রুত উত্তেজিত করছে।
সতর্ক থাকবেন যেভাবে
নির্বাচনের এই সময়ে অনলাইনে দেখা যেকোনো ভিডিও বা চটকদার শিরোনাম দেখেই বিশ্বাস করবেন না। ভিডিওটি কাটছাঁট করা হয়েছে কিনা বা মূল বক্তব্য কী ছিল, তা যাচাই করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, আপনার একটি শেয়ার বা ভুল মন্তব্য সমাজে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।




